প্রথম অধ্যায়

বিষাদ-যােগ

শ্লোক ১


ধৃতরাষ্ট্র উবাচ 

ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ। 

মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয় ॥ ১ ॥


ধৃতরাষ্ট্রঃ উবাচ—মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বললেন; ধর্মক্ষেত্রে–ধর্মক্ষেত্রে; কুরুক্ষেত্রে -কুরুক্ষেত্র নামক স্থানে,  সমবেতাঃ—সমবেত হয়ে ; যুযুৎসবঃ—যুদ্ধকামী;  মামকাঃ—আমার দল (পুত্রেরা); পাণ্ডবাঃ—পাণ্ডুর পুত্রেরা; —এবং; এব— অবশ্যই; কিম—কি; অকুবর্ত- করেছিল; সঞ্জয়ঃ - হে সঞ্জয়।


গীতার গান

ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে হইয়া একত্র । 

যুদ্ধকামী মমপুত্র পাণ্ডব সর্বত্র ॥

 কি করিল তারপর কহত সঞ্জয় । 

 ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসয়ে সন্দিগ্ধ হৃদয় ॥


অনুবাদ

 ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করলেন—হে সঞ্জয়! ধর্মক্ষেত্রে যুদ্ধ করার মানসে সমবেত হয়ে আমার পুত্র এবং পাণ্ডুর পুত্রেরা তারপর কি করল?

তাৎপর্য 

ভগবদগীতা হচ্ছে বহুজন-পঠিত ভগবৎ-তত্ত্ববিজ্ঞান, যাঁর মর্ম গীতা-মাহাত্মে বর্ণিত  হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভগবদগীতা পাঠ করতে হয় ভগবৎ-তত্ত্বদর্শী কৃষ্ণভক্তের তত্ত্বাবধানে। ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে গীতার বিশ্লেষণ করা কখনই উচিত নয়। গীতার যথাযথ অর্থ উপলব্ধি করার দৃষ্টান্ত ভগবদগীতাই আমাদের সামনে তুলে ধরেছে অর্জুনের মাধ্যমে, যিনি স্বয়ং ভগবানের কাছ থেকে  সরাসরিভাবে এই গীতার জ্ঞান লাভ করেছিলেন। অর্জুন ঠিক যেভাবে গীতার মর্ম উপলব্ধি করেছিলেন, ঠিক সেই দৃষ্টিভঙ্গি ও মনােবৃত্তি নিয়ে সকলেরই গীতা পাঠ করা উচিত। তা হলেই গীতার যথাযথ মর্ম উপলব্ধি করা সম্ভব। সৌভাগ্যবশত যদি কেউ গুরুপরম্পরাসূত্রে ভগবদগীতার মনগড়া ব্যাখ্যা ব্যতীত যথাযথ অর্থ উপলব্ধি করতে পারেন, তবে তিনি সমস্ত বৈদিক জ্ঞান এবং পৃথিবীর  সব রকমের শাস্ত্রজ্ঞান আয়ত্ত করতে সক্ষম হন। ভগবদগীতা পড়ার সময় আমরা দেখি, অন্য সমস্ত শাস্ত্রে যা কিছু আছে, তা সবই ভগবদগীতায় আছে, উপরন্তু  ভগবদগীতায় এমন অনেক তত্ত্ব আছে যা আর কোথাও নেই। এটিই হচ্ছে গীতার মাহাত্ম্য এবং এই জন্যই গীতাকে সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্র বলে অভিহিত করা হয়। গীতা হচ্ছে পরম তত্ত্বদর্শন, কারণ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে এই জ্ঞান দান করে গেছেন।

মহাভারতে বর্ণিত ধৃতরাষ্ট্র ও সঞ্জয়ের আলােচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে ভগবদগীতার মহৎ তত্ত্বদর্শনের মূল উপাদান। এখানে আমরা জানতে পারি যে, এই মহৎ তত্ত্বদর্শন প্রকাশিত হয়েছিল কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে, যা সুপ্রাচীন বৈদিক সভ্যতার সময় থেকেই পবিত্র তীর্থস্থানরূপে খ্যাত। ভগবান যখন মানুষের উদ্ধারের জন্য এই পৃথিবীতে অবতরণ করেছিলেন, তখন এই পবিত্র তীর্থস্থানে তিনি নিজে পরম তত্ত্ব সমন্বিত এই গীতা দান করেন।

এই শ্লোকে ধর্মক্ষেত্র শব্দটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন তথা পাণ্ডবদের পক্ষে ছিলেন। দুর্যোধন আদি কৌরবদের পিতা ধৃতরাষ্ট্র তার পুত্রদের বিজয় সম্ভাবনা সম্বন্ধে অত্যন্ত সন্দিগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। দ্বিধাগ্রস্ত-চিত্তে তাই তিনি সঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার পুত্র ও পাণ্ডুর পুত্রেরা তারপর কি করল?” তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, তার পুত্র ও পাণ্ডুপুত্রেরা কুরুক্ষেত্রের বিস্তীর্ণ ভূমিতে যুদ্ধ করবার জন্য সমবেত হয়েছিলেন। কিন্তু তবুও তার অনুসন্ধানটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি চাননি যে, পাণ্ডব ও কৌরবের মধ্যে কোন আপস-মীমাংসা হােক, কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন যুদ্ধে তার পুত্রদের ভাগ্য সুনিশ্চিত হােক। তার কারণ হচ্ছে কুরুক্ষেত্রের পুণ্য তীর্থে এই যুদ্ধের আয়ােজন হয়েছিল। বেদে বলা হয়েছে, কুরুক্ষেত্র হচ্ছে অতি পবিত্র স্থান, যা দেবতারাও পূজা করে থাকেন। তাই, ধৃতরাষ্ট্র এই যুদ্ধের ফলাফলের উপর এই পবিত্র স্থানের প্রভাব সম্বন্ধে শঙ্কাকুল হয়ে পড়েছিলেন। তিনি খুব ভালভাবে জানতেন যে, অর্জুন এবং পাণ্ডুর অন্যান্য পুত্রদের উপর এই পবিত্র স্থানের মঙ্গলময় প্রভাব সঞ্চারিত হবে, কারণ তাঁরা সকলেই ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। সঞ্জয় ছিলেন ব্যাসদেবের শিষ্য, তাই ব্যাসদেবের আশীর্বাদে তিনি দিব্যচক্ষু প্রাপ্ত হন, যার ফলে তিনি ঘরে বসেও কুরুক্ষেত্রের সমস্ত ঘটনা দেখতে পাচ্ছিলেন। তাই, ধৃতরাষ্ট্র তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রের  পরিস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। পান্ডবেরা  এবং ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা ছিলেন একই বংশজাত, কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রের মনােভাব এখানে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি কেবল তাঁর পুত্রদেরই কৌরব বলে গণ্য করে পাণ্ডর পুত্রদের বংশগত উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন। এভাবে ভ্রাতুষ্পুত্র বা পাণ্ডুর পুত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমেই ধৃতরাষ্ট্রের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি সদয়ঙ্গম করা যায়। ধানক্ষেতে যেমন আগাছাগুলি তুলে ফেলে দেওয়া হয়, তেমনই ভগবদ্গীতার সূচনা থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে ধর্মের প্রবর্তক ভগবান স্বয়ং উপস্থিত থেকে ধৃতরাষ্ট্রের পাপিষ্ঠ পুত্রদের সমূলে উৎপাটিত করে ধার্মিক যুধিষ্ঠিরের নেতৃত্বে ধর্মপরায়ণ মহাত্মাদের পুনঃ প্রতিষ্ঠা করবার আয়ােজন করেছেন। বৈদিক এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছাড়াও সমগ্র গীতার তত্ত্বদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মক্ষেত্রে ও কুরুক্ষেত্রে—এই শব্দ দুটি ব্যবহারের তাৎপর্য বুঝতে পারা যায়।


শ্লোক ২


সঞ্জয় উবাচ 

দৃষ্ট্বা তু পাণ্ডবানীকং ব্যূঢ়ং দুর্যোধনস্তদা ।

আচার্যমুপসঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীৎ ॥ ২॥

 সঞ্জয়ঃ উবাচ—সঞ্জয় বললেন; দৃষ্টা-দর্শন করে; তু—কিন্তু; পাণ্ডবানীকম্ — পাণ্ডবদেব সৈন্য; ব্যূঢ়ম্ —সামরিক ব্যূহ ; দুর্যোধনঃ-রাজা দুর্যোধন; তদা—সেই সময়; আচার্যম্—দ্রোণাচার্য, উপসঙ্গম্য- কাছে গিয়ে; রাজা- রাজা; বচনম্-  বাক্য; অব্রবীৎ - বলেছিলেন।

গীতার গান

 সঞ্জয় কহিল রাজা শুন মন দিয়া ।

পাণ্ডবের সৈন্যসজ্জা সাজান দেখিয়া ॥

রাজা দুর্যোধন শীঘ্র দ্রোণাচার্য পাশে ।।

যাইয়া বৃত্তান্ত সব কহিল সকাশে ।।


অনুবাদ

সঞ্জয় বললেন-হে রাজন! পাণ্ডবদের সৈন্যসজ্জা দর্শন করে রাজা দুর্যোধন দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে বললেন—

তাৎপর্য

ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন জন্মান্ধ। দুর্ভাগ্যবশত, তিনি পারমার্থিক তত্ত্বদর্শন থেকেও বঞ্চিত  ছিলেন। তিনি ভালভাবেই জানতেন যে, ধর্মের ব্যাপারে তাঁর পুত্রেরাও ছিল তারই মতাে অন্ধ, এবং তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, তাঁর পাপিষ্ঠ পুত্রেরা পাণ্ডবদের সঙ্গে কোন রকম আপস-মীমাংসা করতে সক্ষম হবে না, কারণ পাণ্ডবেরা সকলেই জন্ম থেকে অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ছিলেন। তবুও তিনি ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের প্রভাব সম্বন্ধে সন্দিগ্ধ ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি সম্বন্ধে ধৃতরাষ্ট্রের এই প্রশ্ন করার প্রকৃত উদ্দেশ্য সঞ্জয় বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি নৈরাশ্যগ্রস্ত রাজাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, এই পবিত্র ধর্মক্ষেত্রের প্রভাবের ফলে তার সন্তানেরা পাণ্ডবদের সঙ্গে কোন রকম আপস-মীমাংসা করতে সক্ষম হবে না। সঞ্জয় তখনই ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন যে, তাঁর পুত্র দুর্যোধন পাণ্ডবদের মহৎ সৈন্যসজ্জা দর্শন করে, তার বিবরণ দিতে তৎক্ষণাৎ সেনাপতি দ্রোণাচার্যের কাছে উপস্থিত হলেন। দুর্যোধনকে যদিও রাজা বলা হয়েছে, তবুও সেই সঙ্কটময় অবস্থায় তাকে তার সেনাপতির কাছে উপস্থিত হতে দেখা যাচ্ছে। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি, চতুর রাজনীতিবিদ হবার সমস্ত গুণগুলি দুর্যোধনের মধ্যে বর্তমান ছিল। কিন্তু পাণ্ডবদের মহতী সৈন্যসজ্জা দেখে দুর্যোধনের মনে যে মহাভয়ের সঞ্চার হয়েছিল, তা তিনি তার চতুরতার আবরণে ঢেকে রাখতে পারেননি।


শ্লোক ৩

পশ্যৈতাং পাণ্ডুপুত্ৰাণামাচার্য  মহতীং চমূম্ ।

ব্যূঢ়াং  দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা ॥ ৩॥

পশ্য— দেখুন; এতাম্ —এই; পাণ্ডুপুত্ৰাণাম্ - পাণ্ডুর পুত্রদের; আচার্য - হে আচার্য,   মহতীম্ -মহান; চমূম্ –সৈন্যবল; ব্যূঢ়াম্-  ব্যূহ; দ্রুপদপুত্রেণ - দ্রুপদের পুত্র  কর্তৃক,     তব—আপনার; শিষ্যেণ—শিয্যের দ্বারা; ধীমতা—অত্যন্ত বুদ্ধিমান। 


গীতার গান

আচার্য চাহিয়া দেখ মহতী সেনানী ।

পাণ্ডুপুত্র রচিয়াছে ব্যূহ নানাস্থানী । ।

তব শিষ্য বুদ্ধিমান দ্রুপদের পুত্র।

সাজাইল এই সব করি একসূত্র ।। 


অনুবাদ

হে আচার্য! পাণ্ডবদের মহান সৈন্যবল দর্শন করুন, যা আপনার অত্যন্ত বুদ্ধিমান শিষ্য দ্রুপদের পুত্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যূহের আকারে রচনা করেছে।


তাৎপর্য

 চতুর কূটনীতিবিদ দুর্যোধন মহৎ ব্রাহ্মণ সেনাপতি দ্রোণাচার্যকে তার ভুল-ত্রুটিগুলি দেখিয়ে দিয়ে তাকে সতর্ক করে দিতে চেয়েছিলেন। পঞ্চপাণ্ডবের পত্নী দ্রৌপদীর পিতা দ্রুপদরাজের সঙ্গে দ্রোণাচার্যের কিছু রাজনৈতিক মনোমালিন্য ছিল। এই মনােমালিন্যের ফলে দ্রুপদ এক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন, এবং সেই যজ্ঞের ফলে তিনি বর লাভ করেন যে, তিনি এক পুত্র লাভ করবেন, যে দ্রোণাচার্যকে হত্যা করতে সক্ষম হবে। দ্রোণাচার্য এই বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে অবগত ছিলেন, কিন্তু দ্রুপদ তাঁর সেই পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্নকে যখন অস্ত্রশিক্ষার জন্য তার কাছে প্রেরণ করেন, তখন উদার হৃদয় সত্যনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ দ্রোণাচার্য তাকে সব রকমের অস্ত্রশিক্ষা এবং সমস্ত সামরিক কলা-কৌশলের গুপ্ত তথ্য শিখিয়ে দিতে কোনও দ্বিধা করেননি। এখন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে ধৃষ্টদ্যুম্ন পাণ্ডবদের পক্ষে যোগদান করেন এবং পাণ্ডবদের সৈন্যসজ্জা তিনিই পরিচালনা করেন, যেই শিক্ষা তিনি দ্রোণাচার্যের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। দ্রোণাচার্যের এই ত্রুটির কথা দুর্যোধন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, যাতে তিনি পূর্ণ সতর্কতা ও অনমনীয় দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। দুর্যোধন মহৎ, ব্রাহ্মণ দ্রোণাচার্যকে এটিও মনে করিয়ে দিলেন যে, পাণ্ডবদের, বিশেষ করে তাৰ্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তিনি যেন কোন রকম কোমলতা প্রদর্শন না করেন, কারণ তাঁরাও সকলে তার প্রিয় শিষ্য, বিশেষত অর্জুন ছিলেন সবচেয়ে প্রিয় ও মেধাবী শিষ্য। দুর্যোধন সতর্ক করে দিতে চেয়েছিলেন যে, এই ধরনের কোমলতা প্রকাশ পেলে যুদ্ধে অবধারিতভাবে পরাজয় হবে।


শ্লোক ৪-৬ 


অত্র শূরা মহেষ্বাসা ভীমার্জুনসমা যুধি ।

যুযুধানো বিরাটশ্চ দ্রুপদশ্চ মহারথঃ ॥ ৪ ॥

 ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশিরাজশ্চ বীর্যবান্ ।

পুরুজিৎ কুন্তিভােজশ্চ শৈব্যশ্চ নরপুঙ্গবঃ ॥ ৫॥

 যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্যবান্ ।

সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব এব মহারথাঃ ॥ ৬ ॥


 অত্র — এখানে;  শূরাঃ - বীরগণ;  মহেষ্বাসাঃ -  বলবান ধনুর্ধরগণ; ভীমার্জুন - ভীম ও অর্জুন; সমাঃ - সমকক্ষ; যুধি - যুদ্ধে; যুযুধানঃ — যুযুধান; বিরাটঃ — বিরাট; চ — ও; দ্রুপদঃ — দ্রুপদ; —ও; মহারথঃ — মহারথী; ধৃষ্টকেতুঃ — ধৃষ্টকেতু; চেকিতানঃ -  চেকিতান; কাশিরাজঃ - কাশিরাজ; চ —ও; বীর্যবান — অত্যন্ত বলবান; পুরুজিৎ - পুরুজিৎ; কুন্তিভােজঃ - কুন্তিভােজ;  —এবং; শৈব্যঃ — শৈব্য; —ও; নরপুঙ্গবঃ —মানব-সমাজে শ্রেষ্ঠ; যুধামন্যুঃ — যুধামন্যু; —এবং; বিক্রান্তঃ—বলবান; উত্তমৌজাঃ—উত্তমৌজা; —এবং; বীর্যবান—অত্যন্ত শক্তিশালী; সৌভদ্রঃ— সুভদ্রার পুত্র; দ্রৌপদেয়াঃ—দ্রৌপদীর পুত্রেরা; —এবং; সর্বে—সকলে; এব— অবশ্যই; মহারথাঃ- মহারথীগণ।


গীতার গান


এইস্থানে বর্তমান বহু যােদ্ধাগণ।

 ভীমার্জুনসম তারা ধনুর্ধারী হন ॥ 

যুযুধান বিরাট দ্রুপদ মহারথী সব । 

ধৃষ্টকেতু চেকিতান কাশীর পুঙ্গব ৷। 

পুরুজিৎ কুন্তিভােজ শৈব্যরাজাগণ ।

যুধামন্যু বিক্রান্ত নহে সাধারণ ॥

 বীর্যবান যে এই সৌভদ্র দ্রৌপদেয় ।

 সকলেই মহারথী কেহ নহে হেয় ॥


অনুবাদ

সেই সমস্ত সেনাদের মধ্যে অনেকে ভীম ও অর্জুনের মতাে বীর ধনুর্ধারী রয়েছে। এবং যুযুধান, বিরাট ও দ্রুপদের মতাে মহাযােদ্ধা রয়েছেন। সেখানে ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, কাশিরাজ, পুরুজিৎ, কুন্তিভােজ ও শৈব্যের মতাে অত্যন্ত বলবান যােদ্ধারাও রয়েছেন। সেখানে রয়েছেন অত্যন্ত বলবান যুধামন্যু, প্রবল  পরাক্রমশালী উত্তমৌজা, সুভদ্রার পুত্র এবং দ্রৌপদীর পুত্রগণ। এই সব যােদ্ধারা সকলেই এক-একজন মহারথী।


 তাৎপর্য

যদিও দ্রোণাচার্যের অসীম শৌর্য, বীর্য ও সামরিক কলা-কৌশলের কাছে ধৃষ্টদ্যুম্ন ছিলেন এক অতি নগণ্য প্রতিবন্ধক এবং তার ভয়ে ভীত হবার কোন কারণই ছিল না দ্রোণাচার্যের পক্ষে, কিন্তু ধৃষ্টদ্যুম্ন ছাড়াও পাণ্ডবপক্ষে অন্য অনেক রথী-মহারথী ছিলেন, যারা সত্যিসত্যিই ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দুর্যোধনের পক্ষে সেই যুদ্ধজয়ের পথে তারা ছিলেন এক-একটি দুরতিক্রম্য প্রতিবন্ধকের মতাে, কারণ তারা সকলেই ছিলেন ভীম ও অর্জুনের মতাে ভয়ংকর। তাঁদের বীরত্বের কথা দুর্যোধন ভালভাবেই জানতেন, তাই তিনি অন্যান্য রথী-মহারথীদেরও ভীম ও অর্জুনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।


শ্লোক ৭


 অস্মাকন্তু বিশিষ্টা যে তান্নিবােধ দ্বিজোত্তম।

নায়কা মম সৈন্যস্য সংজ্ঞার্থং তান্ ব্রবীমি তে ॥ ৭ ॥


 অস্মাকম্ —আমাদের; তু—কিন্তু; বিশিষ্টাঃ—বিশেষভাবে শক্তিমান; যে—যাঁরা; তান্ —তাঁদের; নিবােধ—জেনে রাখুন; দ্বিজোত্তম—দ্বিজশ্রেষ্ঠ; নায়কাঃ - সেনানায়কগণ; মম—আমার; সৈন্যস্য—সৈন্যদের; সংজ্ঞার্থম্ —অবগতির জন্য; তান্—তাঁদের;  ব্রবীমি—আমি বলছি,  তে—আপনাকে।


গীতার গান 


 আমাদের মধ্যে যারা বিশিষ্ট মহান ।

 দ্বিজোত্তম শুন তাহা করিয়া মনন ॥

সেনাপতি যে যে সব মম সৈন্যপাশে ।

সংজ্ঞার্থে তােমারে কহি অশেষ বিশেষে ॥


অনুবাদ

হে দ্বিজোত্তম! আমাদের পক্ষে যে সমস্ত বিশিষ্ট সেনাপতি সামরিক শক্তি পরিচালনার জন্য রয়েছেন, আপনার অবগতির জন্য আমি তাদের সম্বন্ধে বলছি।


শ্লোক ৮ 


ভবান্ ভীষ্মশ্চ কর্ণশ্চ কৃপশ্চ সমিতিঞ্জয়ঃ ।

অশ্বত্থামা বিকর্ণশ্চ সৌমদত্তিস্তথৈব চ ॥ ৮ ॥ 


ভবান্ —আপনি স্বয়ং; ভীষ্মঃ—পিতামহ ভীষ্ম; —ও; কর্ণঃ- কুন্তীপুত্ৰ কৰ্ণ, —এবং; কৃপঃ—কৃপাচার্য; —এবং; সমিতিঞ্জয়ঃ—সর্বদা সংগ্রামে বিজয়ী; অশ্বত্থামা—দ্রোণাচার্যের পুত্র অশ্বত্থামা; বিকর্ণঃ—দুর্যোধনের ভ্রাতা বিকর্ণ; —ও; সৌমদত্তিঃ—সােমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবা; তথা—এবং; এব—অবশ্যই; - ও।


গীতার গান

 আপনি আর পিতামহ ভীষ্মাদিগণ ।

কৃপাচার্য রণজয়ী হয় একত্রে বর্ণন ॥

 অশ্বত্থামা বিকর্ণাদি সৌমদত্তি আর ।

যথাযথা তথা তথা সৈন্য সে অপার ॥


অনুবাদ

সেখানে রয়েছেন আপনার মতােই ব্যক্তিত্বশালী—ভীষ্ম, কর্ণ, কৃপা, অশ্বত্থামা, বিকর্ণ ও সােমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবা, যাঁরা সর্বদা সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে থাকেন।


তাৎপর্য

পাণ্ডব-পক্ষের রথী-মহারথীদের বর্ণনা করবার পর দুর্যোধন তার স্বপক্ষে যে সমস্ত বীরেরা যােগদান করেছেন তাঁদের বর্ণনা করেছে। বিকর্ণ হচ্ছেন দুর্যোধনের ভাই, অশ্বত্থামা হচ্ছেন দ্রোণাচার্যের পুত্র এবং সৌমদত্তি বা ভূরিশ্রবা হচ্ছেন বাহ্লীকের রাজার ছেলে। কর্ণ ছিলেন অর্জুনের বৈপিত্রেয় ভ্রাতা, কেন না রাজা পাণ্ডুর সঙ্গে বিবাহ হবার আগে কুন্তীদেবীর কোলে তাঁর জন্ম হয়। কৃপাচার্যের যমজ ভগ্নীদ্বয়ের সাথে দ্রোণাচার্যের বিবাহ হয়।


শ্লোক ৯


অন্যে চ বহবঃ শূরা মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ ।

নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে যুদ্ধবিশারদাঃ  ॥ ৯ ॥


অন্যে—অন্য অনেকে; - ও, বহবঃ - বহু, শূরাঃ—সেনানায়কগণ;  মদর্থে—আমার জন্য; ত্যক্তজীবিতাঃ—তাঁদের জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত; নানা - নানা প্রকার; শস্ত্র—অস্ত্রশস্ত্র; প্রহরণাঃ—সুসজ্জিত; সর্বে–তাঁরা সকলে; যুদ্ধবিশারদাঃ—সামরিক বিজ্ঞানে অভিজ্ঞ যােদ্ধা।


গীতার গান

 আর যে অনেক বীর আমার লাগিয়া ।

আসিয়াছে হেথা সব জীবন ত্যজিয়া ॥

নানা-অস্ত্রপাণি সব যুদ্ধে বিশারদ ।

এরা সব হয় মাের যুদ্ধের সংসদ ৷।


অনুবাদ

এ ছাড়া আরও বহু সেনানায়ক রয়েছেন, যাঁরা আমার জন্য তাঁদের জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত। তাঁরা সকলেই নানা প্রকার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং তারা সকলেই সামরিক বিজ্ঞানে বিশারদ।


তাৎপর্য


অন্য আর যে সমস্ত বীরেরা দুর্যোধনের পক্ষে ছিলেন, যেমন—জয়দ্রথ, কৃতবর্মা, শল্য আদি, এঁরা সকলেই দুর্যোধনের জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত ছিলেন। এখানে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পাপিষ্ঠ দুর্যোধনের পক্ষ অবলম্বন করার ফলে কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে এঁদের সকলেরই মৃত্যু অবধারিত ছিল। দুর্যোধনের কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এই সমস্ত বীরপুঙ্গবেরা স্বপক্ষে থাকায় তার জয় অনিবার্য।


শ্লোক ১০-১১

 অপর্যাপ্তং তদস্মাকং বলং ভীষ্মভিরক্ষিতম্ ।

পর্যাপ্তং ত্বিদমেতেষাং বলং ভীমাভিরক্ষিতম্ ॥ ১০ ॥

অয়নেষু চ সর্বেষু যথাভাগমবস্থিতাঃ ।

ভীষ্মমেবাভিরক্ষন্তু ভবন্তঃ সর্ব এব হি ॥ ১১ ॥


অপর্যাপ্তম্ -অপরিমিত; তৎ—তা; অস্মাকম্ —আমাদের; বলম্ - বল; ভীষ্ম— পিতামহ ভীষ্মের দ্বারা; অভিরক্ষিতম্ —সম্পূর্ণরূপে রক্ষিত; পর্যাপ্তম্—সীমিত; তু— কিন্তু; ইদম্ —এই সমস্ত; এতেষাম্ - পাণ্ডবদের; বলম্ - বল; ভীম—ভীমের দ্বারা; অভিরক্ষিতম্ —সতর্কভাবে রক্ষিত; অয়নেষু—যথাস্থানে; —ও; সর্বেষু—সর্বত্র; যথাভাগম্ —যথাযথভাবে বিভক্ত হয়ে; অবস্থিতাঃ—অবস্থিত; ভীষ্মম্ -পিতামহ ভীষ্মকে; এব—অবশ্যই; অভিরক্ষন্তু -  রক্ষা করুন; ভবন্তঃ—আপনারা; সর্বে -  সকলে; এব হি - নিশ্চিতভাবে।।


গীতার গান


 অপর্যাপ্ত মম সৈন্য ভীষ্ম সেনাপতি ।

পর্যাপ্ত ওদের সৈন্য ভীম যার গতি ॥

যথাস্থানে স্থিত থাকি আপনি সকলে।

রক্ষ ভীষ্ম পিতামহে হেন যুদ্ধস্থলে ৷।


অনুবাদ

 আমাদের সৈন্যবল অপরিমিত এবং আমরা পিতামহ ভীষ্মের দ্বারা পূর্ণরূপে সুরক্ষিত, কিন্তু ভীমের দ্বারা সতর্কভাবে সুরক্ষিত পাণ্ডবদের শক্তি সীমিত। এখন আপনারা সকলে সেনাব্যূহের প্রবেশপথে নিজ নিজ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থিত হয়ে পিতামহ ভীষ্মকে সর্বতােভাবে সাহায্য প্রদান করুন।


তাৎপর্য

এখানে দুর্যোধন পাণ্ডব-পক্ষ ও কৌরব-পক্ষের সামরিক শক্তির তুলনা করেছে। পিতামহ বীরশ্রেষ্ঠ ভীষ্মদেবের রক্ষণাবেক্ষণাধীন অমিত শক্তিশালী এক সৈন্যবাহিনী ছিল দুর্যোধনের স্বপক্ষে। অপর পক্ষে, পাণ্ডবদের সৈন্যবাহিনী ছিল সীমিত এবং তার সেনাপতি ছিলেন ভীমসেন, যাঁর শৌর্যবীর্য ও সৈন্য পরিচালনার ক্ষমতা পিতামহ ভীষ্মদেবের তুলনায় ছিল নিতান্তই নগণ্য। দুর্যোধন চিরকালই ভীমের প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিল। কারণ সে জানত যে, যদি তাকে কোন দিন মরতে হয়, তবে ভীমের হাতেই তার মৃত্যু হবে। কিন্তু ভীষ্মের মতাে বিচক্ষণ ও দুর্ধর্ষ যােদ্ধা তার পক্ষের সেনাপতি থাকায় সে নিশ্চিতভাবে ধরে নিয়েছিল, জয় তার হবেই। দুর্যোধনের প্রতিটি কথাতে বােঝা যাচ্ছে, যুদ্ধজয় সম্বন্ধে তার মনে কোনই সংশয় ছিল না।


ভীষ্মের শৌর্যবীর্যের প্রশংসা করার পরে, দুর্যোধন বিবেচনা করে দেখল, অন্যেরা মনে করতে পারে, তাঁদের শৌর্যবীর্যের গুরুত্ব লাঘব করে হেয় করা হচ্ছে, তাই তার স্বভাবসুলভ কুটনৈতিক চাতুরীর সাহায্যে সেই পরিস্থিতির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সে উপরােক্ত কথাগুলি বলেছিল। এভাবে সে মনে করিয়ে দিল যে, ভীষ্মদেব যত বড় যােদ্ধাই হন, তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন এবং সব দিক থেকে তাই ভীষ্মদেবকে তাদের সকলেরই রক্ষা করা উচিত। যুদ্ধ করতে করতে যদি তিনি কোনও একদিকে এগিয়ে যান, তা হলে শত্রুপক্ষ তার সুযােগ নিয়ে অন্য দিক থেকে আক্রমণ করতে পারে। তাই অন্য বীরপুঙ্গবেরা যাতে নিজ নিজ স্থানে অধিষ্ঠিত থেকে শত্রুসৈন্যকে ব্যুহ ভেদ করতে না দেয়, তার গুরুত্ব সম্বন্ধে দ্রোণাচার্যকে দুর্যোধন মনে করিয়ে দিয়েছিল। দুর্যোধন স্পষ্টই অনুভব করেছিল যে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তার জয়লাভ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে ভীষ্মদেবের উপর। দুর্যোধনের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, সেই যুদ্ধে ভীষ্মদেব ও দ্রোণাচার্য তাকে সম্পূর্ণভাবে সহযােগিতা করবেন। কারণ সে আগেই দেখেছিল, যখন হস্তিনাপুরের রাজসভায় সমস্ত রাজপুরুষের সামনে দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ করা হচ্ছিল, তখন তাদের প্রতি অসহায় দ্রৌপদীর আকুল আবেদনে সাড়া দিয়ে তারা একটি কথাও বলেননি। যদিও দুর্যোধন জানত, তার দুই সেনাপতিই পাণ্ডবদের বেশ স্নেহ করতেন, কিন্তু তার বিশ্বাস ছিল যে, পাশা খেলার নিয়মানুসারে তারা যেমন তাদের স্নেহপ্রবণতা বর্জন করেছিলেন, এই যুদ্ধেও তাঁরা তাই করবেন।


শ্লোক ১২

তস্য সঞ্জনয়ন্ হর্ষং কুরুবৃদ্ধ পিতামহঃ ।

সিংহনাদং বিনদ্যোচ্চৈঃ শঙ্খং দধ্মৌ প্রতাপবান্ ॥ ১২।। 


তস্য—তাঁর; সঞ্জনয়ম্ - বর্ধিত করে; হর্ষম্—হর্ষ, কুরুবৃদ্ধঃ - কুরুবংশের মধ্যে বৃদ্ধ; পিতামহঃ - পিতামহ; সিংহনাদম্ —সিংহের মতাে গর্জন; বিনদ্য—কম্পিত করে; উচ্চৈঃ—অতি উচ্চনাদে; শঙ্খম্ —শঙ্খ; দধ্মৌ - বাজালেন; প্রতাপবান্ — প্রতাপশালী।


গীতার গান

তবে সেই পিতামহ বৃদ্ধ কুরুপতি ।

হর্ষ উৎপাদনে যবে কৈল স্থিরমতি ৷।

সিংহনাদে বাজাইল শঙ্খ সেই বীর ।

 উচ্চরব সেই সব অতীব গম্ভীর ॥


অনুবাদ

তখন কুরুবংশের বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম দুর্যোধনের হর্য উৎপাদনের জন্য সিংহের গর্জনের মতাে অতি উচ্চনাদে তাঁর শঙ্খ বাজালেন।


তাৎপর্য

কুরু-রাজবংশের পিতামহ দুর্যোধনের হৃদকম্প অনুভব করতে পেরে তার স্বভাবসুলভ করুণার বশবর্তী হয়ে তাকে উৎসাহিত করবার জন্য সিংহনাদে তার শঙ্খ বাজালেন। পরােক্ষভাবে, শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে তিনি তার হতাশাচ্ছন্ন পৌত্র দুর্যোধনকে জানিয়ে দিলেন যে, এই যুদ্ধে জয়লাভ করার কোন আশাই তার নেই, কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন তার বিপক্ষে। তবুও, ক্ষাত্রধর্ম অনুসারে জয়-পরাজয়ের কথা বিবেচনা না করে যুদ্ধ করাই তার কর্তব্য এবং এই ব্যাপারে তিনি কোন রকম অবহেলা করবেন না। সেই কথা তিনি দুর্যোধনকে মনে করিয়ে দিলেন।


শ্লোক ১৩

 ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ ।

সহসৈবাভ্যহন্যন্ত স শব্দস্তুমুলোহভবৎ ॥ ১৩ ৷৷ 


ততঃ—তারপর; শঙ্খাঃ —শঙ্খসমূহ; —ও; ভের্যঃ - ভেরীসমূহ; —এবং; পণব - আনক—পণব ও আনক ঢাক; গােমুখাঃ—গােমুখ শিঙা; সহসা—হঠাৎ; এব— অবশ্যই; অভ্যহন্যন্ত—একসঙ্গে বাজতে লাগল; সঃ—সেই; শব্দঃ—মিলিত শব্দ; তুমুলঃ—তুমুল; অভবৎ -হয়েছিল।


গীতার গান

শুনি সেই শত্রুরব যত শঙ্খ ভেরী ।

গােমুখ পণবানক বাজিল সত্বরি ॥

সহসা উঠিল সেই রণের ঝঙ্কার ।

তুমুল হইল শব্দ বহুল অপার ৷।


অনুবাদ

তারপর শঙ্খ, ভেরী, পণব, আনক, ঢাক ও গােমুখ শিঙাসমূহ হঠাৎ একত্রে ধ্বনিত হয়ে এক তুমুল শব্দের সৃষ্টি হল।


শ্লোক ১৪

ততঃ শ্বেতৈর্হয়ৈর্যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ ।

মাধবঃ পাণ্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধ্মতুঃ ॥ ১৪ ॥ 


ততঃ—তখন; শ্বেতৈঃ—শ্বেত; হয়ৈঃ—অশ্বগণ; যুক্তে—যুক্ত হয়ে; মহতি -  মহান; স্যন্দনে - রথ; স্থিতৌ—অবস্থিত হয়ে; মাধবঃ—শ্রীকৃষ্ণ (লক্ষ্মীর পতি); পাণ্ডবঃ—অর্জুন (পাণ্ডুর পুত্র); - ও; এব—অবশ্যই,   দিব্যৌ—অপ্রাকৃত; শঙ্খৌ -  শঙ্খগুলি; প্রদধ্মতুঃ - বাজালেন।


গীতার গান

 তারপর শ্বেত অশ্ব রথেতে বসিয়া ।

 আসিল যে মহাযুদ্ধে নিযুক্ত হইয়া ॥

মাধব আর পাণ্ডব দিব্য শঙ্খ ধরি ।

বাজাইল পরে পরে অপূর্ব মাধুরী ॥


অনুবাদ

অন্য দিকে, শ্বেত অশ্বযুক্ত এক দিব্য রথে স্থিত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন উভয়ে তাঁদের দিব্য শঙ্খ বাজালেন।


তাৎপর্য 

ভীষ্মদেবের শঙ্খের সঙ্গে বৈসাদৃশ্য দেখিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের শঙ্খকে ‘দিব্য' বলে  অভিহিত করা হয়েছে। এই দিব্য শঙ্খধ্বনি ঘােষণা করল যে, কুরুপক্ষের যুদ্ধজয়ের কোন আশাই নেই, কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবপক্ষে যােগদান করেছেন। জয়স্তু পাণ্ডপুত্ৰাণাং যেষাং পক্ষে জনার্দনঃ। পাণ্ডবদের জয় অবধারিত, কারণ জনার্দন  শ্রীকৃষ্ণ  তাঁদের পক্ষে যােগ দিয়েছেন। ভগবান যে পক্ষে যােগদান করেন, সৌভাগ্য-লক্ষ্মীও সেই পক্ষেই থাকেন, কারণ সৌভাগ্য-লক্ষ্মী সর্বদাই তাঁর পতির অনুগামী। তাই বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের দিব্য শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে ঘােষিত হল যে, অর্জুনের জন্য বিজয় ও সৌভাগ্য প্রতীক্ষা করছে। তা ছাড়া, যে রথে চড়ে দুই বন্ধু শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তা অগ্নিদেব অর্জুনকে দান করেছিলেন এবং সেই দিব্য রথ ছিল সমগ্র ত্রিভুবনে সর্বত্রই অপরাজেয়। 


শ্লোক ১৫

পাঞ্চজন্যং হৃষীকেশাে দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ । 

পৌন্ড্রং দধ্মৌ মহাশঙ্খং ভীমকর্মা বৃকোদরঃ ॥ ১৫ ॥


পাঞ্চজন্যম্ —পাঞ্চজন্য নামক শঙ্খ;  হৃষীকেশঃ—হৃষীকেশ (শ্রীকৃষ্ণ, যিনি তাঁর  ভক্তদের ইন্দ্রিয়ের পরিচালক); দেবদত্তম্ —দেবদত্ত নামক শঙ্খ; ধনঞ্জয়ঃ—ধনঞ্জয় (অর্জুন, যিনি ধনসম্পদ জয় করেছেন); পৌন্ড্রম্  —পৌন্ড্র নামক শঙ্খ; দধ্মৌ — বাজালেন; মহাশঙ্খম্  - ভয়ংকর শঙ্খ; ভীমকর্মা—প্রচণ্ড কর্ম সম্পাদনকারী; বৃকোদরঃ—বিপুল ভােজনপ্রিয় (ভীম)।


গীতার গান

 হৃষীকেশ ভগবান্ পাঞ্চজন্যরবে ।

ধনঞ্জয় বাজাইল দেবদত্ত সবে ॥

ভীমকর্মা ভীমসেন বাজাইল পরে ।

পৌন্ড্রনাম শঙ্খ সেই অতি উচ্চৈঃস্বরে ॥


অনুবাদ

তখন, শ্রীকৃষ্ণ পাঞ্চজন্য নামক তাঁর শঙ্খ বাজালেন অর্জুন বাজালেন, তাঁর দেবদত্ত নামক শঙ্খ এবং বিপুল ভােজনপ্রিয় ও ভীমকর্মা ভীমসেন বাজালেন পৌণ্ড্র নামক তাঁর ভয়ংকর শঙ্খ। 


 তাৎপর্য 

শ্রীকৃষ্ণকে এই শ্লোকে হৃষীকেশ বলা হয়েছে, যেহেতু তিনি হচ্ছেন সমস্ত হৃষীক বা ইন্দ্রিয়ের ঈশ্বর । জীবেরা হচ্ছে তাঁর অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই জীবদের ইন্দ্রিয়গুলি হচ্ছে তার ইন্দ্রিয়সমূহের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নির্বিশেষবাদীরা জীবের ইন্দ্রিয়সমূহের  মূল উৎস কোথায় তার হদিস খুঁজে পায় না, তাই তারা সমস্ত জীবদের ইন্দ্রিয়বিহীন ও নির্বিশেষ বলে বর্ণনা করতে তৎপর। সমস্ত জীবের অন্তরে অবস্থান করে ভগবান তাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে পরিচালিত করেন। তবে এটি নির্ভর করে আত্মসমর্পণের মাত্রার উপর এবং শুদ্ধ ভক্তের ক্ষেত্রে তার ইন্দ্রিয়গুলিকে ভগবান প্রত্যক্ষভাবে পরিচালিত করেন। এখানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের দিব্য ইন্দ্রিয়গুলিকে ভগবান সরাসরিভাবে পরিচালিত করেছেন, তাই এখানে তাঁকে হৃষকেশ নামে অভিহিত করা হয়েছে। ভগবানের বিভিন্ন কার্যকলাপ অনুসারে তাঁর ভিন্ন ভিন্ন নাম আছে। যেমন, মধু নামক দানবকে সংহার করার জন্য তার নাম মধুসূদন; গাভী ও ইন্দ্রিয়গুলিকে আনন্দ দান করেন বলে তার নাম গােবিন্দ; বসুদেবের পুত্ররূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলে তার নাম বাসুদেব; দেবকীর সন্তানরূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম দেবকীনন্দন; বৃন্দাবনে যশােদার সন্তানরূপে তিনি তার বাল্যলীলা প্রদর্শন করেন বলে তার নাম যশােদানন্দন এবং সখা অর্জুনের রথের সারথি হয়েছিলেন বলে তার নাম পার্থসারথি। সেই রকম, কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে পরিচালনা করেছিলেন বলে তার নাম হৃষীকেশ।

এখানে অর্জুনকে ধনঞ্জয় বলে অভিহিত করা হয়েছে, কারণ বিভিন্ন যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান করার জন্য তিনি যুধিষ্ঠিরকে ধন সংগ্রহ করতে সাহায্য করতেন। তেমনই, ভীমকে এখানে বৃকোদর বলা হয়েছে, কারণ যেমন তিনি হিড়িম্ব আদি দানবকে বধ করার মতাে দুঃসাধ্য কাজ সাধন করতে পারতেন, তেমনই তিনি প্রচুর পরিমাণে আহার করতে পারতেন। সুতরাং পাণ্ডবপক্ষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহ বিভিন্ন ব্যক্তিরা যখন তাদের বিশেষ ধরনের শঙ্খ বাজালেন, সেই দিব্য শঙ্খধ্বনি তাদের সৈন্যদের অন্তরে অনুপ্রেরণা সঞ্চার করল। পক্ষান্তরে, কৌরবপক্ষে আমরা কোন রকম শুভ লক্ষণের ইঙ্গিত পাই না, সেই পক্ষে পরম নিয়ন্তা ভগবান নেই, সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মীদেবীও নেই। অতএব, তাঁদের পক্ষে যে যুদ্ধ-জয়ের কোন আশাই ছিল না তা পূর্বেই নির্ধারিত ছিল এবং যুদ্ধের শুরুতেই শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে সেই। বার্তা ঘােষিত হল।


 শ্লোক ১৬-১৮

অনন্তবিজয়ং রাজা কুন্তীপুত্রো যুধিষ্ঠিরঃ ।।

নকুলঃ সহদেবশ্চ সুঘােষমণিপুষ্পকৌ ॥ ১৬ ॥

কাশ্যশ্চ পরমেষ্বাসঃ শিখণ্ডী চ মহারথঃ ।

 ধৃষ্টদ্যুম্নো বিরাটশ্চ সাত্যকিশ্চাপরাজিতঃ ॥ ১৭ ॥

দ্রুপদো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্বশঃ পৃথিবীপতে ।

সৌভদ্রশ্চ মহাবাহুঃ শঙ্খন্  দধ্মু পৃথক্ পৃথক্ ॥ ১৮ ॥


অনন্তবিজয়ম—অনন্তবিজয় নামক শঙ্খ; রাজা -  রাজা; কুন্তীপুত্রঃ—কুন্তীর পুত্র; যুধিষ্ঠিরঃ—যুধিষ্ঠির; নকুলঃ - নকুল; সহদেবঃ—সহদেব; —এবং; সুঘােষ-মণিপুষ্পকৌ  - সুঘােষ ও মণিপুষ্পক নামক শঙ্খ; কাশ্যঃ - কাশীর (বারাণসীর) রাজা;    —এবং; পরমেষ্বাসঃ—মহান ধনুর্ধর; শিখণ্ডী—শিখণ্ডী; —ও; মহারথঃ - সহস্র সহস্র যােদ্ধার বিরুদ্ধে একাকী যুদ্ধ করতে সক্ষম মহারথী; ধৃষ্টদ্যুম্নঃ— (মহারাজ দ্রুপদের পুত্র) ধৃষ্টদ্যুম্ন; বিরাটঃ - বিরাট (যিনি পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাস কালে আশ্রয় দিয়েছিলেন); —ও; সাত্যকিঃ—সাত্যকি (শ্রীকৃষ্ণের সারথি যুযুধানের মতাে); —এবং; অপরাজিতঃ—যিনি কখনও পরাজিত হননি; দ্রুপদঃ - পাঞ্চালের রাজা দ্রুপদ; দ্রৌপদেয়াঃ - দ্রৌপদীর পুত্রগণ; —ও; সর্বশঃ—সকলে; পৃথিবীপতে—হে মহারাজ; সৌভদ্রঃ - সুভদ্রার পুত্র অভিমন্যু; —ও; মহাবাহুঃ—মহা বলবান্,  শঙ্খান্—শঙ্খসমূহ; দধ্মুঃ -বাজালেন; পৃথক্ -পৃথক্—একে একে।


গীতার গান


যুধিষ্ঠির ধরে শঙ্খ রাজা কুন্তীপুত্র ।

অনন্তবিজয় সেই ঘােষণা সর্বত্র ॥

নকুল বাজাল শঙ্খ সুঘােষ তার নাম।

সহদেব বাজাল মণিপুষ্পক নাম ॥

তারপর একে একে যত মহারথী।

ধনুর্ধর কাশীরাজ শিখণ্ডী সারথি ॥

ধৃষ্টদ্যুম্ন বিরাটাদি বীর সে সাত্যকি ।

মহাযােদ্ধা পারে যারা যুঝিতে একাকী ।।

দ্রুপদ আর দ্রৌপদেয় পৃথিবীপতে ।।

সৌভদ্র বাজাল শঙ্খ যার যার মতে ॥


অনুবাদ

কুন্তীপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠির অনন্তবিজয় নামক শঙ্খ বাজালেন এবং নকুল ও সহদেব বাজালেন সুঘােষ ও মণিপুষ্পক নামক শঙ্খ। হে মহারাজ! তখন মহান ধনুর্ধর কাশীরাজ, প্রবল যােদ্ধা শিখণ্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট, অপরাজিত সাত্যকি, দ্রুপদ, দ্রোপদীর পুত্রগণ, সুভদ্রার মহা বলবান পুত্র এবং অন্য সকলে তাঁদের নিজ নিজ পৃথক শঙ্খ বাজালেন।


তাৎপর্য

সঞ্জয় সুকৌশলে ধৃতরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিলেন যে, পাণ্ডুপুত্রদের প্রতারণা করে নিজের ছেলেদের সিংহাসনে বসাবার দুরভিসন্ধি করাটা তার পক্ষে মােটেই প্রশংসনীয় কাজ হয়নি। চারদিক থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে, কুরুবংশের সমূলে বিনাশ হবে এবং পিতামহ ভীষ্ম থেকে শুরু করে অভিমন্যু আদি পৌত্রেরা সকলেই যুদ্ধে নিহত হবেন। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে উপস্থিত রাজা-মহারাজা ও রথী-মহারথীরা সকলেই নিহত হবেন। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিলেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র স্বয়ং, কারণ তাঁর পুত্রদের দুষ্কর্মে তিনি কখনও কোন রকম বাধা দেননি, উপরন্তু তাদের সব রকম দুষ্কর্মে তিনি অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন।


শ্লোক ১৯

 স ঘােষাে ধার্তরাষ্ট্রাণাং হৃদয়ানি ব্যদারয়ৎ ।

নভশ্চ পৃথিবীং চৈব তুমুলােহভ্যনুনাদয়ন্ ॥ ১৯ ॥


 সঃ—সেই; ঘােষঃ—শব্দ-স্পন্দন; ধার্তরাষ্ট্ৰাণাম্—ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের; হৃদয়ানি - হৃদয়; ব্যদারয়ৎ—চূর্ণবিচূর্ণ করেছিল; নভঃ—আকাশ; —ও; পৃথিবীম্ -  পৃথিবীকে,  —ও; এব—অবশ্যই; তুমুলঃ—প্রচণ্ড; অভ্যনুনাদয়ন্ —অনুরণিত হয়ে।


গীতার গান

সে শব্দ ভাঙিল বুক ধার্তরাষ্ট্রগণে।

আকাশ ভেদিল পৃথ্বী কাঁপিল সঘনে ॥


অনুবাদ

শঙ্খ-নিনাদের সেই প্রচণ্ড শব্দ আকাশ ও পৃথিবী প্রতিধ্বনিত করে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় বিদারিত করতে লাগল।


তাৎপর্য

ভীষ্মদেব আদি কৌরব-পক্ষের বীরেরা যখন শঙ্খ বাজিয়েছিলেন, তখন পাণ্ডবদের বুক ভয়ে কেঁপে ওঠেনি। কিন্তু এই শ্লোকে আমরা দেখছি যে, পাণ্ডবদের শঙ্খনাদে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় ভয়ে বিদীর্ণ হল। পাণ্ডবদের মনে কোন ভয় ছিল না, কারণ তাঁরা ছিলেন সদাচারী এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত। ভগবানের কাছে  যিনি আত্মসর্মপণ করেন, তাঁর মনে কোন ভয় থাকে না, চরম বিপদেও তিনি থাকেন অবিচলিত।


শ্লোক ২০

অথ ব্যবস্থিতান্ দৃষ্ট্বা ধার্তরাষ্ট্রান্ কপিধ্বজঃ ।

প্রবৃত্তে শস্ত্রসম্পাতে ধনুরুদ্যম্য পাণ্ডবঃ ।

হৃষীকেশং তদা বাক্যমিদমাহ মহীপতে ॥ ২০ ॥


অথ—অতঃপর; ব্যবস্থিতা—অবস্থিত; দৃষ্ট্বা—দেখে; ধার্তরাষ্ট্রান্ -ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের; কপিধ্বজঃ—যাঁর পতাকায় হনুমান চিহ্ন শােভা পায়; প্রবৃত্তে—প্রবৃত্ত হওয়ার সময়; শস্ত্রসম্পাতে—অস্ত্র নিক্ষেপ করতে; ধনুঃ-ধনুক; উদ্যম্য - তুলে নিয়ে; পাণ্ডবঃ—পাণ্ডুপুত্র (অর্জুন); হৃষীকেশম্ –শ্রীকৃষ্ণকে; তদা—তখন; বাক্যম্ - বাক্য; ইদম্—এই; আহ - বললেন; মহীপতে—হে মহারাজ।


গীতার গান

কপিধ্বজ দেখি ধার্তরাষ্ট্রের গণেরে ।

যুদ্ধের সজ্জায় সেথা মিলিল অচিরে ॥

নিজ অস্ত্র ধনুর্বাণ যথাস্থানে ধরি ।

যুদ্ধের লাগিয়া সেথা স্মরিল শ্রীহরি ॥


অনুবাদ

সেই সময় পাণ্ডুপুত্র অর্জুন হনুমান চিহ্নিত পতাকা শােভিত রথে অধিষ্ঠিত হয়ে, তাঁর ধনুক তুলে নিয়ে শর নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত হলেন। হে মহারাজ! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সমরসজ্জায় বিন্যস্ত দেখে, অর্জুন তখন শ্রীকৃষ্ণকে এই কথাগুলি বললেন


তাৎপর্য

কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই, পাণ্ডবদের অপ্রত্যাশিত সৈন্যসজ্জা  দেখে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদকম্প শুরু হয়ে গেছে। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে উপস্থিত থেকে পাণ্ডবদের পরিচালিত করেছিলেন, তাই কৌরবদের এই হৃদকম্প হওয়াটা স্বাভাবিক। অর্জুনের রথে হনুমান অঙ্কিত ধ্বজাও একটি বিজয়সূচক ইঙ্গিত, কারণ রাম-রাবণের যুদ্ধে হনুমান শ্রীরামচন্দ্রকে সহযােগিতা করেছিলেন এবং শ্রীরামচন্দ্র বিজয়ী হয়েছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও অর্জুনকে সাহায্য করবার জন্য তাঁর রথে শ্রীরামচন্দ্র ও হনুমান দুজনকেই উপস্থিত থাকতে দেখতে পাই। শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন শ্রীরামচন্দ্র এবং যেখানে শ্রীরামচন্দ্র, সেখানেই তাঁর নিত্য সেবক ভক্ত-হনুমান এবং নিত্য সঙ্গিনী সীতা লক্ষ্মীদেবী উপস্থিত থাকেন। তাই, অর্জুনের কোন শত্রুর ভয়েই ভীত হবার কারণ ছিল না, আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অধীশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে পরিচালিত করবার জন্য স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। এভাবে, যুদ্ধজয়ের সমস্ত শুভ পরামর্শ অর্জুন পাচ্ছিলেন। তাঁর নিত্যকালের ভক্তের জন্য ভগবানের দ্বারা আয়ােজিত এই রকম শুভ পরিস্থিতিতে সুনিশ্চিত জয়েরই ইঙ্গিত বহন করে।


শ্লোক ২১-২২

অর্জুন উবাচ

সেনয়ােরুভয়াের্মধ্যে রথং স্থাপয় মেহচ্যুত ।

যাবদেতান্নিরীক্ষেহহং যােদ্ধুকামানবস্থিতান্ ॥ ২১ ॥

কৈর্ময়া সহ যােদ্ধব্যমস্মিন্ রণসমুদ্যমে ॥ ২২ ॥


 অর্জুনঃ উবাচ—অর্জুন বললেন; সেনয়ােঃ—সৈন্যদের; উভয়ােঃ—উভয়; মধ্যে - মধ্যে; রথম্ - রথ ; স্থাপয়—স্থাপন কর; মে—আমার; অচ্যুত—হে অচ্যুত; যাবৎ - যাতে; এতান্—এই সমস্ত; নিরীক্ষে—দেখতে পারি; অহম্ —আমি; যােদ্ধুকামান্ - যুদ্ধ করতে অভিলাষী; অবস্থিতান্ —যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থিত; কৈঃ - কাদের সঙ্গে; ময়া—আমাকে; সহ–সঙ্গে; যােদ্ধব্যম্‌ - যুদ্ধ করতে হবে; অস্মিন্ —এই; রণ— সংগ্রাম ;  সমুদ্যমে—প্রচেষ্টায়। 


গীতার গান

মহীপতে! পাণ্ডুপুত্র কহে হৃষীকেশে ।

 উভয় সেনার মাঝে রথের প্রবেশে।৷

যাবৎ দেখিব এই যুদ্ধকামীগণে।

 তাবৎ রাখিবে রথ অচ্যুত এখানে ॥

দেখিবারে চাহি কেবা আসিয়াছে হেথা ।

কাহার সহিত হবে যুষিবারে সেথা ।৷ 


অনুবাদ

অর্জুন বললেন-হে অচ্যুত! তুমি উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে আমার রথ স্থাপন কর, যাতে আমি দেখতে পারি যুদ্ধ করার অভিলাষী হয়ে কারা এখানে এসেছে এবং এই মহা সংগ্রামে আমাকে কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে।


তাৎপর্য

যদিও শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, তবুও তিনি অহৈতুকী কৃপাবশে তাঁর প্রিয় সখা অর্জুনের রথের সারথি হয়ে তাঁর সেবা করছেন। ভক্তের প্রতি করুণা প্রদর্শনে ভগবান কখনও চ্যুত হন না, তাই তাঁকে এখানে অচ্যুত বলে সম্ভাষণ করা হয়েছে। অর্জুনের রথের সারথি হবার ফলে তাকে অর্জুনের আদেশ অনুযায়ী কাজ করতে হয়েছিল এবং যেহেতু তা করতে তিনি কুণ্ঠিত হননি, তাই তাঁকে অচ্যুত বলে সম্বােধন করা হয়েছে। যদিও তিনি তাঁর ভক্তের রথের সারথি হয়েছেন, তবুও তাঁর পরম পদ কেউ দাবি করতে পারে না। সকল অবস্থাতেই তিনি হচ্ছেন পরম পুরুষ ভগবান বা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অধীশ্বর হৃষীকেশ। ভগবানের সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ক মধুর ও অপ্রাকৃত। ভক্ত সর্বদাই ভগবানের সেবায় উন্মুখ, ঠিক তেমনই ভগবানও তাঁর ভক্তের কোন রকম পরিচর্যা করতে সুযােগের অন্বেষণ করেন। ভগবান যখন তাঁর কোন শুদ্ধ ভক্তের আদেশ অনুসারে তাঁকে পরিচর্যা করার সুযােগ পান, তখন তিনি অসীম আনন্দ উপভােগ করেন। ভগবান হচ্ছেন সর্বলােকমহেশ্বর। যেহেতু তিনি হচ্ছেন প্রভু, প্রত্যেকেই তাঁর আদেশের অধীন, এবং তাই তাকে আদেশ দেবার মতাে তাঁর ঊর্ধ্বে আর কেউ নেই। কিন্তু যখন তিনি দেখেন যে, কোন শুদ্ধ ভক্ত তাকে আদেশ করছেন, তখন তিনি দিব্য আনন্দ লাভ করেন, যদিও সকল অবস্থাতেই তিনি হচ্ছেন অভ্রান্ত প্রভু।

ভগবানের শুদ্ধ ভক্তরূপে অর্জুন কখনই কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাননি, কিন্তু কোন রকম শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করতে অনাগ্রহী দুর্যোধনের দুর্দমনীয় মনােভাব তাঁকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বাধ্য করেছিল। তাই, তিনি যুদ্ধের আগে একবার দেখে নিতে চেয়েছিলেন, তাঁর বিপক্ষে যুদ্ধ করতে কে কে সেই রণাঙ্গনে উপস্থিত হয়েছিল। যদিও যুদ্ধক্ষেত্রে শান্তি স্থাপন করার কোন প্রশ্নই ওঠে না, তবুও যুদ্ধের আগে অর্জুন একবার সকলকে দেখতে চেয়েছিলেন এবং তিনি দেখে নিতে চেয়েছিলেন সেই অন্যায় যুদ্ধে কৌরবেরা কতখানি উৎসাহি  ছিল।


শ্লোক ২৩

যােৎস্যমানানবেক্ষেহহং য এতেহত্র সমাগতাঃ ।

ধার্তরাষ্ট্রস্য দুর্বুদ্ধেযুর্দ্ধে প্রিয়চিকীর্ষবঃ ॥ ২৩ ৷৷


যােৎস্যমানান্ —যারা যুদ্ধ করবে; অবেক্ষে—দেখতে চাই; অহম্ —আমি; যে— যে; এতে—যারা; অত্র—এখানে; সমাগতাঃ - সমবেত হয়েছে; ধার্তরাষ্ট্রস্য - ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রের পক্ষে; দুর্বুদ্ধেঃ—দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন; যুদ্ধে - যুদ্ধে; প্রিয়—ভাল; চিকীর্ষবঃ - বাসনা করে। 


গীতার গান 

যুদ্ধকামীগণে আজ নিরখিব আমি ।

দুর্বুদ্ধি ধার্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধকামী ॥


অনুবাদ

ধৃতরাষ্ট্রের দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন পুত্রকে সন্তুষ্ট করার বাসনা করে যারা এখানে যুদ্ধ করতে এসেছে, তাদের আমি দেখতে চাই।


তাৎপর্য

এই কথা সকলেরই জানা ছিল যে, দুর্যোধন তার পিতা ধৃতরাষ্ট্রের সহযােগিতায় অন্যায়ভাবে পাণ্ডবদের রাজত্ব আত্মসাৎ করতে চেষ্টা করছিল। তাই, যারা দুর্যোধনের পক্ষে যােগ দিয়েছিল, তারা সকলেই ছিল ‘এক গােয়ালের গরু' । যুদ্ধের প্রারম্ভে অর্জুন দেখে নিতে চেয়েছিলেন তারা কারা। কৌরবদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করবার সব রকম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার ফলেই কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের আয়ােজন করা হয়, তাই সেই যুদ্ধক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার কোন রকম বাসনা অর্জুনের ছিল না। অর্জুন যদিও স্থির নিশ্চিতভাবে জানতেন, জয় তাঁর হবেই, কারণ শ্রীকৃষ্ণ তার পাশেই বসে আছেন, তবুও যুদ্ধের প্রারম্ভে তিনি শত্রুপক্ষের সৈন্যবল কতটা তা দেখে নিতে চেয়েছিলেন। 



শ্লোক ২৪


সঞ্জয় উবাচ

 এবমুক্তো হৃষীকেশাে গুড়াকেশেন ভারত।

 সেনয়ােরুভয়াের্মধ্যে স্থাপয়িত্বা রথােত্তমম্ ॥ ২৪ ॥


সঞ্জয়ঃ উবাচ—সঞ্জয় বললেন; এবম্—এভাবে; উক্তঃ—আদিষ্ট হয়ে; হৃষীকেশঃ—শ্রীকৃষ্ণ; গুড়াকেশেন—অর্জুনের দ্বারা; ভারত—হে ভরতবংশীয়; সেনয়ােঃ—সৈন্যদের; উভয়োঃ—উভয় পক্ষের ; মধ্যে—মধ্যে; স্থাপয়িত্বা—স্থাপন করে; রথ-উত্তমম্‌—অতি উত্তম রথ।

গীতার গান

সে কথা শুনিয়া হৃষীকেশ ভগবান্ ।
উভয় সেনার দিকে হইল আগুয়ান ॥
উভয় সেনার মধ্যে রাখি রথােত্তম।
কহিতে লাগিল কৃষ্ণ হইয়া সম্ভ্রম ॥

অনুবাদ

সঞ্জয় বললেন—হে ভরতবংশধর! অর্জুন কর্তৃক এভাবে আদিষ্ট হয়ে, শ্রীকৃষ্ণ সেই অতি উত্তম রথটি চালিয়ে নিয়ে উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে রাখলেন।

তাৎপর্য

এই শ্লোকে অর্জুনকে গুড়াকেশ বলে অভিহিত করা হয়েছে। গুড়াকা মানে হচ্ছে  নিদ্রা এবং যিনি নিদ্রা জয় করেছেন, তাঁকে বলা হয় গুড়াকেশ। নিদ্রা অর্থে অজ্ঞানতাকেও বােঝায়। অতএব শ্রীকৃষ্ণের বন্ধুত্ব লাভ করার ফলে অর্জুন নিদ্রা ও অজ্ঞানতা উভয়কেই জয় করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্ত অর্জুন এক মুহূর্তের  জন্যও শ্রীকৃষ্ণকে বিস্মৃত হতেন না, কারণ এটিই হচ্ছে ভক্তের লক্ষণ। শয়নে অথবা জাগরণে ভক্ত ভগবানের নাম, রূপ, গুণ ও লীলা স্মরণে কখনও বিরত হন না। এভাবেই কৃষ্ণভক্ত সর্বদাই কৃষ্ণচিন্তায় মগ্ন থেকে নিদ্রা ও অজ্ঞানতা জয় করতে পারেন। একেই বলা হয় কৃষ্ণভাবনা বা সমাধি। হৃষীকেশ অথবা সমস্ত জীবের ইন্দ্রিয় ও মনের নিয়ন্তা হবার ফলে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের অভিপ্রায় বুঝতে পেরেছিলেন, কেন তাকে সৈন্যের মধ্যে রথ স্থাপন করতে বলেছেন। এভাবে অর্জুনের নির্দেশ পালন করার পর তিনি বললেন।


শ্লোক ২৫

ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখতঃ সর্বেষাং চ মহীক্ষিতাম্।
উবাচ পার্থ পশ্যৈতান্ সমবেতান্ কুরূনিতি ॥ ২৫ ॥


ভীষ্ম—পিতামহ ভীষ্ম; দ্রোণ—দ্রোণাচার্য; প্রমুখতঃ - সম্মুখে; সর্বেষাম্ —সমস্ত; —ও; মহীক্ষিতাম্ -  নৃপতিদের; উবাচ—বললেন; পার্থ—হে পার্থ, পশ্য—দেখ; এতান্—এদের সকলকে; সমবেতান্ —সমবেত; কুরূন্  - কুরুবংশের সমস্ত সদস্যদের; ইতি—এভাবে।



গীতার গান

দেখ পার্থ সমবেত ধার্তরাষ্ট্রগণ ।
ভীষ্ম দ্রোণ প্রমুখত যত যােদ্ধাগণ ॥


অনুবাদ

ভীষ্ম, দ্রোণ প্রমুখ পৃথিবীর অন্য সমস্ত নৃপতিদের সামনে ভগবান হৃষীকেশ বললেন, হে পার্থ! এখানে সমবেত সমস্ত কৌরবদের দেখ।

তাৎপর্য

সর্বজীবের পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ জানতেন অর্জুনের মনে কি হচ্ছিল। এই প্রসঙ্গে তাঁকে হৃষীকেশ বলার মধ্য দিয়ে বােঝানাে হচ্ছে, তিনি সবই জানতেন, তিনি সর্বজ্ঞ। এখানে অর্জুনকে পার্থ, অর্থাৎ পৃথা বা কুন্তীর পুত্র বলে অভিহিত করাটাও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বন্ধু হিসাবে তিনি অর্জুনকে জানাতে চেয়েছিলেন যে, যেহেতু অর্জুন হচ্ছেন তাঁর পিতা বসুদেবের ভগ্নী পৃথার পুত্র, তাই তিনি তার রথের সারথি হতে সম্মত হয়েছেন। এখন শ্রীকৃষ্ণ যখন বললেন, “দেখ পার্থ, সমবেত ধার্তরাষ্ট্রগণ”, তখন তিনি কি অর্থ করেছিলেন? সেই জন্যই কি অর্জুন সেখানে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে, যুদ্ধ করতে অসম্মত হননি? পিতামহ ভীষ্ম, পিতৃতুল্য আচার্য দ্রোণ, এঁদের দেখে কি অর্জুনের হৃদয় আর্দ্র হয়ে ওঠেনি? কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পিতৃষ্বসা কুন্তীদেবীর পুত্র অর্জুনের কাছ থেকে এমন আচরণ কখনই আশা করেননি। অর্জুনের মনের ভাব বুঝতে পেরে পরিহাসছলে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভবিষ্যৎবাণী করলেন।



শ্লোক ২৬

তত্রাপশ্যৎ স্থিতান্ পার্থঃ পিতৃনথ পিতামহান্ ।
আচাৰ্যান্মাতুলান্ ভ্রাতৃন্ পুত্রান্ পৌত্রান্ সখীংস্তথা ।
শ্বশুরান্ সুহৃদশ্চৈব সেনয়ােরুভয়ােরপি ॥ ২৬ ॥


তত্র—সেখানে; অপশ্যৎ—দেখলেন; স্থিতান্ —অবস্থিত; পার্থঃ—অর্জুন; পিতৃন্ — পিতৃ ব্যদের; অথ—ও; পিতামহান্ —পিতামহদের; আচার্যান্ —শিক্ষকদের; মাতুলান্ —মাতুলদের; ভ্রাতৃন্ -  ভ্রাতাদের; পুত্রান্ -  পুত্রদের; পৌত্রান্ —পৌত্রদের; সখীন্ -  বন্ধুদের; তথা—ও; শ্বশুরান্ —শ্বশুরদের; সুহৃদঃ—শুভাকাঙ্ক্ষীদের; — ও; এব—অবশ্যই; সেনয়ােঃ—সেনাদলের; উভয়ােঃ—উভয়; অপি—অন্তর্ভুক্ত।



গীতার গান

তারপর দেখে পার্থ যােদ্ধৃপিতৃগণ।
আচার্য মাতুল আদি পিতৃসম হন ॥
দেখে পুত্র পৌত্রাদিক যত সখাজন।
আর সব বহু লােক আত্মীয়স্বজন ॥
 শ্বশুরাদি কুটুম্বীয় নাহি পারাপার ।
উভয়পক্ষীয় সৈন্য সে হল অপার ॥


অনুবাদ

তখন অর্জুন উভয় পক্ষের সেনাদলের মধ্যে পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, শ্বশুর, মিত্র ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিত দেখতে পেলেন।


তাৎপর্য

যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন সমস্ত আত্মীয়স্বজনকে দেখতে পেলেন। তিনি ভূরিশ্রবা আদি পিতৃবন্ধুদের দেখলেন; ভীষ্মদেব, সােমদত্ত আদি পিতামহদের দেখলেন, দ্রোণাচার্য,  কৃপাচার্য আদি শিক্ষা-গুরুদের দেখলেন; শল্য, শকুনি আদি মাতুলদের দেখলেন,  দুর্যোধন আদি ভাইদের দেখলেন; পুত্ৰতুল্য লক্ষ্মণকে দেখলেন; অশ্বত্থামার মতো বন্ধুকে দেখলেন; কৃতবর্মার মতাে শুভাকাঙ্ক্ষীকে দেখলেন। এভাবে শত্রুপক্ষের সৈন্যদের মধ্যে তিনি কেবল আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদেরই দেখলেন।


 শ্লোক ২৭

তান্  সমীক্ষ্য স কৌন্তেয়ঃ সর্বান্ বন্ধুনবস্থিতান্ ।
কৃপয়া পরয়াবিষ্টো বিষীদন্নিদমব্রবীৎ        ॥ ২৭ ॥


তান্ —তাঁদের; সমীক্ষ্য—দেখে; সঃ—তিনি; কৌন্তেয়ঃ-কুন্তীপুত্র; সর্বান্ - সব রকমের; বন্ধূন্ -  বন্ধুদের; অবস্থিতান্ —অবস্থিত; কৃপয়া—কৃপার দ্বারা; পরয়া - অত্যন্ত,  আবিষ্টঃ—অভিভূত হয়ে; বিষীদন্ —দুঃখ করতে করতে; ইদম্ —এভাবে; অব্রবীৎ—বললেন।



গীতার গান

তাদের দেখিল পার্থ সবই বান্ধব।
কাঁপিল হৃদয় তার বিষণ্ণ বৈভব ।
কৃপাতে কাঁদিল মন অতি দয়াবান।
বিষণ্ণ হইয়া বলে শুন ভগবান্ ॥



অনুবাদ

যখন কুন্তীপুত্র অর্জুন সকল রকমের বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনদের যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থিত দেখলেন, তখন তিনি অত্যন্ত কৃপাবিষ্ট ও বিষণ্ণ হয়ে বললেন।


শ্লোক ২৮

অর্জুন উবাচ 
দৃষ্ট্বেমং স্বজনং কৃষ্ণ যুযুৎসুং সমুপস্থিতম্ ।
সীদন্তি মম গাত্রাণি মুখং চ পরিশুষ্যতি ॥ ২৮ ॥

অর্জুনঃ উবাচ—অর্জুন বললেন; দৃষ্ট্বা—দেখে; ইমম্ —এই সমস্ত; স্বজনম্ —আত্মীয় স্বজনদের; কৃষ্ণ—হে কৃষ্ণ; যুযুৎসুম্ —যুদ্ধাভিলাষী; সমুপস্থিতম্ —সমবেত; সীদন্তি - অবসন্ন হচ্ছে, মম —আমার; গাত্রাণি—সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ; মুখম্ -  মুখ; - ও; পরিশুষ্যতি—শুষ্ক হচ্ছে।


গীতার গান

অর্জুন কহয়ে কৃষ্ণ এরা যে স্বজন ।
রণাঙ্গনে আসিয়াছে কারবারে রণ ॥
দেখিয়া আমার গাত্রে হয়েছে রােমাঞ্চ।
মুখমধ্যে রস নাই এ যে মহাবঞ্চ ॥


অনুবাদ

অর্জুন বললেন-হে প্রিয়বর কৃষ্ণ! আমার সমস্ত বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের এমনভাবে যুদ্ধাভিলাষী হয়ে আমার সামনে অবস্থান করতে দেখে আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অবশ হচ্ছে এবং মুখ শুষ্ক হয়ে উঠছে।

তাৎপর্য

যিনি প্রকৃত ভগবদ্ভক্ত তাঁর মধ্যে সদ্গুণগুলিই বর্তমান থাকে, যা সাধারণত দেবতা ও দৈবী ভাবাপন্ন মানুষের মধ্যে কেবল দেখা যায়। পক্ষান্তরে যারা অভক্ত, ভগবৎবিমুখ, তারা জাগতিক শিক্ষা-সংস্কৃতির মাপকাঠিতে যতই উন্নত বলে প্রতীত হােক, তাদের মধ্যে এই সমস্ত দৈব গুণগুলির প্রকাশ একেবারেই দেখা যায় না। সেই কারণেই, যে সমস্ত হীন মনােভাবাপন্ন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু বান্ধবেরা অর্জুনকে সব রকম দুঃখ কষ্টের মধ্যে ঠেলে দিতে কুণ্ঠাবােধ করেনি, যারা তাঁকে তাঁর ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবার জন্য এই যুদ্ধের আয়ােজন করেছিল, এই যুদ্ধক্ষেত্রে তাদেরই দেখে অর্জুনের অন্তরাত্মা কেঁদে উঠেছিল। তার স্বপক্ষের সৈন্যদের প্রতি অর্জুনের সহানুভূতি ছিল অতি গভীর, কিন্তু যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে এমন কি শত্রুপক্ষের সৈন্যদের দেখে এবং তাদের আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে অর্জুন শােকাতুর হয়ে পড়েছিলেন। সেই গভীর শােকে তার শরীর কাঁপছিল, মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। কুরুপক্ষের এই যুদ্ধলালসা তাঁকে আশ্চর্যান্বিত করেছিল। বাস্তবিকপক্ষে সমস্ত শ্রেণীর লােকেরা এবং অর্জুনের রক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত আত্মীয়-স্বজনেরা তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না তাঁর সমস্ত আত্মীয়স্বজনেরা কেন তার সঙ্গে যুদ্ধ করতে সমবেত হয়েছে। তাদের এই নিষ্ঠুর মনােভাব অর্জুনের মতাে দয়ালু ভগবদ্ভক্তকে অভিভূত করেছিল। এখানে যদিও এই কথার উল্লেখ করা হয়নি, তবু আমাদের অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে, অর্জুনের শরীর কেবল শুষ্ক ও কম্পিতই হয়নি, সেই সঙ্গে অনুকম্পা ও সহানুভূতিতে তাঁর চোখ দিয়ে অঝাের ধারায় জলও পড়ছিল। অর্জুনের এই ধরনের আচরণ তাঁর দুর্বলতার প্রকাশ নয়, এ হচ্ছে তাঁর হৃদয়ের কোমলতার প্রকাশ। ভগবানের ভক্ত  করুণার সিন্ধু, অপরের দুঃখে তাঁর অন্তর কাঁদে। তাই, শুদ্ধ ভগবদ্ভক্ত অর্জুন বীরশ্রেষ্ঠ হলেও তাঁর অন্তরের কোমলতার পরিচয় আমরা এখানে পাই।   তাই শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে ---

যস্যাস্তি  ভক্তিৰ্ভগবত্যকিঞ্চনা
                                  সর্বৈগুণৈস্তত্র সমাসতে সুরাঃ।
হরাবভক্তস্য কুতাে মহদ্ গুণা
                                     মনােরথেনাসতি ধাবতাে বহিঃ ॥

 “ভগবানের প্রতি যাঁর অবিচলিত ভক্তি আছে, তিনি দেবতাদের সব কয়টি মহৎ গুণের দ্বারা ভূষিত। কিন্তু যে ভগবদ্ভক্ত নয়, তার যা কিছু গুণ সবই জাগতিক এবং সেগুলির কোনই মূল্য নেই। কারণ, সে মনােধর্মের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং সে অবধারিত ভাবেই চোখ-ধাঁধাঁনাে জাগতিক শক্তির দ্বারা আকর্ষিত হয়ে পড়ে।”

(ভাগবত ৫/১৮/১২)



শ্লোক ২৯ 

বেপথুশ্চ শরীরে মে রােমহর্ষশ্চ জায়তে ।
গাণ্ডীবং স্রংসতে হস্তাৎ ত্বক্ চৈব পরিদহ্যতে ॥ ২৯ ॥

বেপথুঃ- কম্প; - ও; শরীরে—দেহে; মে—আমার; রােমহর্ষঃ—রােমাঞ্চ; — ও; জায়তে—হচ্ছে; গাণ্ডীবম্—গাণ্ডীব নামক অর্জুনের ধনুক; স্রংসতে—স্থলিত হচ্ছে; হস্তাৎ—হাত থেকে; ত্বক্ —ত্বক; —ও; এব—অবশ্যই; পরিদহ্যতে  - দগ্ধ হচ্ছে।


গীতার গান

কঁপিছে শরীর মাের সহিতে না পারি ।
গাণ্ডীব খসিয়া যায় কি করিয়া ধরি ॥
জ্বলিয়া উঠিছে ত্বক মহাতাপ বাণ ।
 হইও না হইও না বন্ধু আর আগুয়ান ॥


অনুবাদ

আমার সর্বশরীর কম্পিত ও রােমাঞ্চিত হচ্ছে, আমার হাত থেকে গাণ্ডীব খসে পড়ছে এবং ত্বক যেন জ্বলে যাচ্ছে।

তাৎপর্য

 শরীরে কম্পন দেখা দেওয়ার দুটি কারণ আছে এবং রােমাঞ্চ হওয়ারও দুটি কারণ আছে। তার একটি হচ্ছে চিন্ময় আনন্দের অনুভূতি এবং অন্যটি হচ্ছে প্রচণ্ড জড়জাগতিক ভয়। অপ্রাকৃত অনুভূতি হলে কোন ভয় থাকে না। অর্জুনের এই রােমাঞ্চ ও কম্পন অপ্রাকৃত আনন্দের অনুভূতির ফলে নয়, পক্ষান্তরে জড়-জাগতিক ভয়ের ফলে। এই ভয়ের উদ্রেক হয়েছিল তাঁর আত্মীয়-পরিজনদের প্রাণহানির আশঙ্কার ফলে। তার অন্যান্য লক্ষণ দেখেও আমরা তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি। অর্জুন এতই অস্থির হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর হাত থেকে গাণ্ডীব ধনু খসে পড়েছিল এবং প্রচণ্ড দুঃখে তাঁর হৃদয় দগ্ধ হবার ফলে, তাঁর ত্বক জ্বলে যাচ্ছিল। এই সমস্ত কিছুরই মূল কারণ হচ্ছে ভয়। অর্জুন এই মনে করে ভীষণভাবে ভীত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর সমস্ত আত্মীয়-স্বজনেরা সেই যুদ্ধে হত হবে এবং এই যে হারাবার ভয়, তারই বাহ্যিক প্রকাশ হচ্ছিল তাঁর দেহের কম্পন, রােমাঞ্চ, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, গা জ্বালা করা আদির মাধ্যমে। গভীরভাবে বিবেচনা করলে আমরা দেখতে পাই, অর্জুনের এই ভয়ের কারণ হচ্ছে, তিনি তাঁর দেহটিকেই তাঁর স্বরূপ বলে মনে করেছিলেন এবং তাঁর দেহের সম্বন্ধে যারা তথাকথিত আত্মীয়, তাদের  হারাবার শােকে তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন।


শ্লোক ৩০

 ন চ শক্নোম্যবস্থাতুং ভ্ৰমতীব চ মে মনঃ ।
            নিমিত্তানি চ পশ্যামি বিপরীতানি কেশব ॥ ৩০ ॥


 ন - না; —ও; শক্নোমি—সক্ষম হই; অবস্থাতুম্ —স্থির থাকতে; ভ্ৰমতি - বিস্মরণ; ইব—যেন; —এবং; মে—আমার; মনঃ—মন; নিমিত্তানি—নিমিত্তসমূহ; —ও; পশ্যামি—দেখছি; বিপরীতানি -  বিপরীত; কেশব—হে কেশী দানবহন্তা (শ্রীকৃষ্ণ)।


গীতার গান 

অস্থির হয়েছি আমি স্থির নহে মন ।
 সব ভুল হয়ে যায় কি করি এখন ॥ 
বিপরীত অর্থ দেখি শুনহ কেশব ।
 এ যুদ্ধে কাজ নাহি হল পণ্ড সব ॥


অনুবাদ 

হে কেশব! আমি এখন আর স্থির থাকতে পারছি না। আমি আত্মবিস্মৃত হচ্ছি এবং আমার চিত্ত উদ্ ভ্রান্ত হচ্ছে। হে কেশী দানবহন্তা শ্রীকৃষ্ণ! আমি কেবল  অমঙ্গলসূচক লক্ষণসমূহ দর্শন করছি।

তাৎপর্য

অর্জুন অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, তাই তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে থাকতে অক্ষম হয়ে  পড়েছিলেন এবং তাঁর মন এতই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল যে, তিনি আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়ছিলেন। জড় জগতের প্রতি অত্যধিক আসক্তি মানুষকে মােহাচ্ছন্ন করে ফেলে। ভয়ং দ্বিতীয়াভিনিবেশতঃ স্যাৎ (ভাগবত ১১/২/৩৭)—এই ধরনের ভীতি ও আত্মবিস্মৃতি তখনই দেখা দেয়, যখন মানুষ জড়া শক্তির দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে পড়ে। অর্জুন অনুভব করেছিলেন, সেই যুদ্ধের পরিণতি হচ্ছে কেবল স্বজন হত্যা এবং এভাবে শত্ৰুনিধন করে যুদ্ধে জয়লাভ করার মধ্যে কোন সুখই তিনি পাবেন না। এখানে নিমিত্তানি বিপরীতানি কথাগুলি তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ যখন নৈরাশ্য ও হতাশার সম্মুখীন হয়, তখন সে মনে করে,  "আমার বেঁচে থাকার তাৎপর্য কি?” সকলেই কেবল তার নিজের সুখ-সুবিধার কথাই চিন্তা করে। ভগবানের বিষয়ে কেউই মাথা ঘামায় না। শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছাতেই অর্জুন তাঁর প্রকৃত স্বার্থ বিষয়ে অজ্ঞতা প্রদর্শন করেছেন। মানুষের প্রকৃত স্বার্থ নিহিত রয়েছে বিষ্ণু অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণেরই মাঝে। মায়াবদ্ধ জীবেরা এই কথা ভুলে গেছে, তাই তারা নানাভাবে কষ্ট পায়। এই দেহাত্মবুদ্ধির প্রভাবে মােহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার ফলে অর্জুন মনে করেছিলেন, তাঁর পক্ষে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয় লাভ করাটা হবে গভীর মর্মবেদনার কারণ।


শ্লোক ৩১

ন চ শ্রেয়ােহনুপশ্যামি হত্বা স্বজনমাহবে ।
                   ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ ॥ ৩১ ॥

ন - না; চ—ও; শ্রেয়ঃ—মঙ্গল; অনুপশ্যামি—দেখছি; হত্বা  - হত্যা করে; স্বজনম্ —আত্মীয়-স্বজনদের; আহবে—যুদ্ধে; ন - না; কাঙ্ক্ষে — আকাঙ্ক্ষা করি; বিজয়ম্ —যুদ্ধে জয়; কৃষ্ণ—হে কৃষ্ণ; ন - না; চ—ও; রাজ্যম্ -  রাজ্য; সুখানি— সুখ; চ -ও।


গীতার গান

কোন হিত নাহি হেথা স্বজনসংহারে।
     যুদ্ধে মাের কাজ নাই ফিরাও আমারে ॥
            হে কৃষ্ণ! বিজয় মাের নাহি সে আকাঙ্ক্ষা । 
 রাজ্য আর সুখ শান্তি সবই আশঙ্কা ॥


অনুবাদ

হে কৃষ্ণ! যুদ্ধে আত্মীয়-স্বজনদের নিধন করা শ্রেয়স্কর দেখছি না। আমি যুদ্ধে জয়লাভ চাই না, রাজ্য এবং সুখভােগও কামনা করি না।

তাৎপর্য

মায়াবদ্ধ মানুষ বুঝতে পারে না, তার প্রকৃত স্বার্থ নিহিত আছে বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের মাঝে। এই কথা বুঝতে না পেরে তারা তাদের দেহজাত আত্মীয়-স্বজনদের দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে তাদের সাহচর্যে সুখী হতে চায়। জীবনের এই প্রকার অন্ধ-ধারণার বশবর্তী হয়ে, তারা এমন কি জাগতিক সুখের কারণগুলিও ভুলে যায়। এখানে অর্জুনের আচরণে আমরা দেখতে পাই, তিনি তাঁর ক্ষাত্রধর্মও ভুলে গেছেন। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, দুই রকমের মানুষ দিব্য আলােকে উদ্ভাসিত সূর্যলােকে উত্তীর্ণ হন, তাঁরা হচ্ছেন (১) শ্রীকৃষ্ণের আজ্ঞানুসারে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে যে ক্ষত্রিয় রণভূমিতে প্রাণত্যাগ করেন, তিনি এবং (২) যে সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী অধ্যাত্ম-চিন্তায় গভীরভাবে অনুরক্ত, তিনি। অর্জুনের অন্তঃকরণ এতই কোমল যে, তাঁর আত্মীয়-স্বজনের প্রাণ হনন করা তাে দূরের কথা, তিনি তাঁর শত্রুকে পর্যন্ত হত্যা করতে নারাজ ছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, তাঁর স্বজনদের হত্যা করে তিনি সুখী হতে পারবেন না। যার ক্ষুধা নেই সে যেমন রান্না করতে চায় না, অর্জুনও তেমন যুদ্ধ করতে চাইছিলেন না। পক্ষান্তরে তিনি স্থির করেছিলেন, অরণ্যের নির্জনতায় নৈরাশ্যপীড়িত জীবন অতিবাহিত করবেন। অর্জুন ছিলেন ক্ষত্রিয়, এই ধর্ম পালন করার জন্য তাঁর রাজত্বের প্রয়ােজন ছিল। কিন্তু ন্যায়সঙ্গতভাবে পাওয়া সেই রাজত্ব থেকে দুর্যোধন আদি কৌরবেরা তাঁকে বঞ্চিত করার ফলে, সেই রাজ্যে তার অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ করতে এসে তিনি যখন দেখলেন, তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করে সেই রাজ্যে তাঁর অধিকারের প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তখন তিনি গভীর দুঃখে ও নৈরাশ্যে স্থির করলেন যে, তিনি সব কিছু ত্যাগ করে বনবাসী হবেন।


শ্লোক ৩২-৩৫

 কিং নাে রাজ্যেন গােবিন্দ কিং ভােগৈর্জীবিতেন বা ।
          যেষামর্থে কাঙ্ক্ষিতং নাে রাজ্যং ভােগাঃ সুখানি চ ॥ ৩২ ॥


ত ইমেহবস্থিতা যুদ্ধে প্রাণাংস্ত্যক্ত্বা ধনানি চ ।
    আচাৰ্যাঃ পিতরঃ পুত্ৰাস্তথৈব চ পিতামহাঃ ॥ ৩৩ ॥

 মাতুলাঃ শ্বশুরাঃ পৌত্রাঃ শ্যালাঃ সম্বন্ধিনস্তথা।
এতান্ন হন্তমিচ্ছামি ঘ্নতােহপি মধুসূদন ॥ ৩৪ ॥

 অপি ত্রৈলােক্যরাজ্যস্য হেতােঃ কিং নু মহীকৃতে ।
    নিহত্য ধার্তরাষ্ট্ৰান্নঃ কা প্রীতিঃ স্যাজ্জনার্দন ॥ ৩৫ ॥


কিম্ -  কি প্রয়ােজন; নঃ—আমাদের; রাজ্যেন—রাজ্যে; গােবিন্দ - হে কৃষ্ণ; কিম্ —কি; ভােগৈঃ—সুখভােগ; জীবিতেন—বেঁচে থেকে; বা—অথবা; যেষাম্ — যাদের; অর্থে- জন্য; কাঙ্ক্ষিতম্—আকাঙ্ক্ষিত; নঃ—আমাদের; রাজ্যম্ -   রাজ্য; ভােগাঃ—ভােগসমূহ; সুখানি—সমস্ত সুখ; —ও; তে—তারা সকলে; ইমে— এই; অবস্থিতাঃ—অবস্থিত; যুদ্ধে - রণক্ষেত্রে; প্রাণান্ —প্রাণ; ত্যক্ত্বা -  ত্যাগ করে; ধনানি - ধনসম্পদ; চ—ও; আচার্যাঃ—আচার্যগণ; পিতরঃ - পিতৃব্যগণ; পুত্রাঃ - পুত্রগণ; তথা—এবং ; এব—অবশ্যই; —ও; পিতামহাঃ—পিতামহগণ; মাতুলাঃ - মাতুলগণ; শ্বশুরাঃ - শ্বশুরগণ; পৌত্রাঃ-পৌত্রগণ; শ্যালাঃ - শ্যালকগণ; সম্বন্ধিনঃকুটুম্বগণ; তথা—এবং; এতান্—এই সমস্ত; - না; হন্তুম্ —হত্যা করতে; ইচ্ছামি - ইচ্ছা করি; ঘ্নতঃ—হত হলে; অপি–ও; মধুসূদন—হে মধু দৈত্যহন্তা (শ্রীকৃষ্ণ); অপি—এমন কি; ত্রৈলােক্য—ত্রিভুবনের; রাজ্যস্য - রাজ্যের জন্য; হেতােঃ—বিনিময়ে; কিম্ নু—কি আর কথা; মহীকৃতে - পৃথিবীর জন্য; নিহত্য— বধ করে; ধার্তরাষ্ট্রান্ -  ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণের; নঃ—আমাদের; কা - কি; প্রীতিঃ— সুখ; স্যাৎ—হবে; জনার্দন—হে সমস্ত জীবের পালনকর্তা।


গীতার গান

যাদের লাগিয়া চাহি সুখ-ভােগ শান্তি। 
      তারাই এসেছে হেথা দিতে সে অশান্তি ॥ 
ধন প্রাণ সব ত্যজি মরিবার তরে। 
সবাই এসেছে হেথা কে জীয়ে কে মরে ॥
 এসেছে আচার্য পূজ্য পিতার সমান।
 সঙ্গে আছে পিতামহ আর পুত্রগণ ॥
মাতুল শ্বশুর পৌত্র কত যে কহিব ।
 শালা আর সম্বন্ধী সবাই মরিব ॥
আমি মরি ক্ষতি নাই এরা যদি মরে ।
এদের মরিতে শক্তি নাহি দেখিবারে ॥
 ত্রিভুবন রাজ্য যদি পাইব জিনিয়া ।
তথাপি না লই তাহা এদের মারিয়া ॥
ধার্তরাষ্ট্রগণে মারি কিবা প্রীতি হবে ।
জনার্দন তুমি কৃষ্ণ আপনি কহিবে ৷


অনুবাদ

হে গােবিন্দ! আমাদের রাজ্যে কি প্রয়ােজন, আর সুখভােগ বা জীবন ধারণেই বা কী প্রয়ােজন, যখন দেখছি—যাদের জন্য রাজ্য ও ভােগসুখের কামনা, তারা সকলেই এই রণক্ষেত্রে আজ উপস্থিত ? হে মধুসূদন! যখন আচার্য, পিতৃব্য, পুত্র, পিতামহ, মাতুল, শ্বশুর, পৌত্র, শ্যালক ও আত্মীয়স্বজন, সকলেই প্রাণ ও ধনাদির আশা পরিত্যাগ করে আমার সামনে যুদ্ধে উপস্থিত হয়েছেন, তখন তাঁরা  আমাকে বধ করলেও আমি তাদের হত্যা করতে চাইব কেন? হে সমস্ত জীবের প্রতিপালক জনার্দন! পৃথিবীর তাে কথাই নেই, এমন কি সমগ্র ত্রিভুবনের বিনিময়েও আমি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নই। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের নিধন করে কি সন্তোষ আমরা লাভ করতে পারব?


তাৎপর্য

অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে গােবিন্দ নামে সম্বােধন করেছেন, যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ গাে অর্থাৎ গরু ও ইন্দ্রিয়গুলিকে আনন্দ দান করেন। এই তাৎপর্যপূর্ণ নামের দ্বারা তাঁকে সম্বােধন করার মাধ্যমে তিনি প্রকাশ করেছেন, কিসে তাঁর নিজের ইন্দ্রিয় তৃপ্ত হবে। বাস্তবিকপক্ষে, গােবিন্দ নিজে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে তৃপ্ত করেন না, কিন্তু আমরা যদি গােবিন্দের ইন্দ্রিয়গুলিকে তৃপ্ত করি, তবে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি আপনা থেকেই তৃপ্ত হয়ে যায়। দেহাত্মবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা তাদের নিজেদের ইন্দ্রিয়গুলির তৃপ্তিসাধন করতে ব্যস্ত এবং তারা চায়, ভগবান তাদের ইন্দ্রিয়গুলির সব রকম তৃপ্তির যােগান দিয়ে যাবেন। যার যতটা ইন্দ্রিয়তৃপ্তি প্রাপ্য, ভগবান তাকে তা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তা বলে আমরা যত চাইব, ভগবান ততই দিয়ে যাবেন, মনে করা ভুল। কিন্তু তার বিপরীত পন্থা গ্রহণ করে, অর্থাৎ যখন আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির কথা না ভেবে গােবিন্দের ইন্দ্রিয়ের সেবায় ব্রতী হই, তখন গােবিন্দের আশীর্বাদে আমাদের সমস্ত বাসনা আপনা থেকেই তৃপ্ত হয়ে যায়। আত্মীয়-স্বজনের প্রতি অর্জুনের গভীর মমতা তাঁর স্বভাবজাত করুণার প্রকাশ এবং এই মমতার বশবর্তী হয়ে তিনি যুদ্ধ করতে নারাজ হন। প্রত্যেকেই নিজের সৌভাগ্য ও ঐশ্বর্য তার বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়- স্বজনকে দেখতে চায়। কিন্তু অর্জুন যখন বুঝতে পারলেন, যুদ্ধে তাঁর সমস্ত আত্মীয়স্বজন নিহত হবে এবং যুদ্ধের শেষে সেই যুদ্ধলব্ধ ঐশ্বর্য ভােগ করবার জন্য তাঁর সঙ্গে আর কেউ থাকবে না, তখন ভয়ে ও নৈরাশ্যে তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়েন। সাংসারিক মানুষের স্বভাবই হচ্ছে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে এই ধরনের হিসাব-নিকাশ এবং জল্পনা-কল্পনা করা। কিন্তু অপ্রাকৃত অনুভূতিসম্পন্ন জীবন অবশ্য ভিন্ন ধরনের। তাই ভগবদ্ভক্তের মনােভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভগবানকে তৃপ্ত করাটাই হচ্ছে তাঁর একমাত্র ব্রত, তাই ভগবান যখন চান, তখন তিনি পৃথিবীর সব রকম ঐশ্বর্য গ্রহণ করতে কুণ্ঠিত হন না। আবার ভগবান যখন চান না, তখন তিনি একটি কপর্দকও গ্রহণ করেন না। অর্জুন সেই যুদ্ধে তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করতে চাননি এবং তাদের হত্যা করাটা যদি একান্তই প্রয়ােজন থাকে, তবে তিনি চেয়েছিলেন, শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাদের বিনাশ করুন। তখনও অবশ্য তিনি জানতেন না, যুদ্ধক্ষেত্রে আসার পূর্বেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায় তারা সকলেই হত হয়ে আছে, এবং সেই ইচ্ছাকে রূপ দেবার জন্য তিনি ছিলেন কেবল একটি উপলক্ষ্য মাত্র। পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে এই কথা বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত অর্জুনের কোন ইচ্ছাই ছিল না তাঁর দুর্বৃত্ত ভাইদের উপর প্রতিশােধ নেবার, কিন্তু ভগবান চেয়েছিলেন তাদের সকলকে বিনাশ করতে। ভগবানের ভক্ত কখনোই কারও প্রতি প্রতিহিংসা  পরায়ণ হন না, অন্যায়ভাবে যে তাঁকে প্রতারণা করে, তার প্রতিও তিনি করুণা বর্ষণ করেন। কিন্তু ভগবানের ভক্তকে যে আঘাত দেয়, ভগবান কখনই তাকে সহ্য করেন না। ভগবানের শ্রীচরণে কোন অপরাধ করলে ভগবান তা ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু তাঁর ভক্তের প্রতি অন্যায় ভগবান ক্ষমা করেন না। তাই অর্জুন যদিও সেই দুবৃর্ত্তদের ক্ষমা করতে চেয়েছিলেন, তবুও ভগবান তাদের বিনাশ করা থেকে নিরস্ত হননি। 



শ্লোক ৩৬
পাপমেবাশ্রয়েদস্মান্  হত্বৈতানাততায়িনঃ ।
 তস্মান্নার্হা বয়ং হন্তুং ধার্তরাষ্ট্রান্  সবান্ধবান্ ।
          স্বজনং হি কথং হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধব ॥ ৩৬ ॥


পাপম্ - পাপ; এব—নিশ্চয়ই; আশ্রয়েৎ—আশ্রয় করবে; অস্মান্ -আমাদের; হত্বা - বধ করলে; এতান্ —এদের সকলকে; আততায়িনঃ—আততায়ীদের; তস্মাৎ—তাই; ন - না; অর্হা—উচিত; বয়ম্ —আমাদের; হন্তুম্ - হত্যা করা; ধার্তরাষ্ট্ৰান্ -  ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের; সবান্ধবান্—সবান্ধব; স্বজনম্ —স্বজনদের; হি— অবশ্যই; কথম্ —কিভাবে; হত্বা - হত্যা করে; সুখিনঃ—সুখী; স্যাম—হব; মাধব— হে লক্ষ্মীপতি শ্রীকৃষ্ণ।


গীতার গান

 এদের মারিলে মাত্র পাপ লাভ হবে । 
এমন বিপক্ষ শত্রু কে দেখেছে কবে ॥
এই ধার্তরাষ্ট্রগণ সবান্ধব হয়।
 উচিত না হয় কার্য তাহাদের ক্ষয় ॥
 স্বজন মারিয়া বল কেবা কবে সুখী । 
সুখলেশ নাহি মাত্র হব শুধু দুঃখী ॥


অনুবাদ

এই ধরনের আততায়ীদের বধ করলে মহাপাপ আমাদের আচ্ছন্ন করবে। সুতরাং বন্ধুবান্ধব সহ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সংহার করা আমাদের পক্ষে অবশ্যই উচিত হবে না। হে মাধব, লক্ষ্মীপতি শ্রীকৃষ্ণ! আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করে আমাদের কী লাভ হবে? আর তা থেকে আমরা কেমন করে সুখী হব?


তাৎপর্য

বেদের অনুশাসন অনুযায়ী শত্রু ছয় প্রকার—১) যে বিষ প্রয়ােগ করে, ২) যে ঘরে আগুন লাগায়, ৩) যে মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে, ৪) যে ধনসম্পদ লুণ্ঠন করে, ৫) যে অন্যের জমি দখল করে এবং ৬) যে বিবাহিত স্ত্রীকে হরণ করে। এই ধরনের আততায়ীদের অবিলম্বে হত্যা করার নির্দেশ শাস্ত্রে দেওয়া হয়েছে এবং এদের হত্যা করলে কোন রকম পাপ হয় না। এই ধরনের শত্রুকে সমূলে বিনাশ করাটাই সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক, কিন্তু অর্জুন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তাঁর চরিত্র ছিল সাধুসুলভ, তাই তিনি তাদের সঙ্গে সাধুসুলভ ব্যবহারই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই ধরনের সাধুসুলভ ব্যবহার ক্ষত্রিয়দের জন্য নয়। যদিও উচ্চপদস্থ রাজপুরুষকে সাধুর মতােই ধীর, শান্ত ও সংযত হতে হয়, তাই 
বলে তাঁকে কাপুরুষ হলে চলবে না। যেমন শ্রীরামচন্দ্র এত সাধু প্রকৃতির ছিলেন যে, পৃথিবীর ইতিহাসে 'রামরাজ্য' শান্তি ও শৃঙ্খলার প্রতীক হিসাবে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করে আছে, কিন্তু তাঁর চরিত্রে কোন রকম কাপুরুষতা আমরা দেখতে পাই না। রাবণ ছিল রামের শত্রু, যেহেতু সে তাঁর পত্নী সীতাদেবীকে হরণ করেছিল এবং সেই জন্য শ্রীরামচন্দ্র তাকে এমন শাস্তি দিয়েছিলেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। অর্জুনের ক্ষেত্রে অবশ্য আমরা দেখতে পাই, তাঁর শত্রুরা ছিল অন্য ধরনের। পিতামহ, শিক্ষক, ভাই, বন্ধু, এরা সকলেই তাঁর শত্রু হবার ফলে সাধারণ শত্রুদের প্রতি যেরকম আচরণ করতে হয়, তা তিনি করতে পারছিলেন না। তা ছাড়া, সাধু প্রকৃতির লােকেরা সর্বদাই ক্ষমাশীল। শাস্ত্রেও সাধু প্রকৃতির লােককে ক্ষমাপরায়ণ হবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সাধুদের প্রতি এই ধরনের উপদেশ যে-কোন রাজনৈতিক সঙ্কটকালীন অনুশাসন থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অর্জুন মনে করেছিলেন, রাজনৈতিক কারণবশত তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করার চেয়ে সাধুসুলভ আচরণ ও ধর্মের ভিত্তিতে তাদের ক্ষমা করাই শ্রেয়। তাই, সাময়িক দেহগত সুখের জন্য এই হত্যাকার্যে লিপ্ত হওয়া তিনি সমীচীন বলে মনে করেননি। তিনি বুঝেছিলেন, রাজ্য ও রাজ্যসুখ অনিত্য। তাই, এই ক্ষণস্থায়ী সুখের জন্য আত্মীয়স্বজন হত্যার পাপে লিপ্ত হয়ে মুক্তির পথ চিরতরে রুদ্ধ করার ঝুঁকি তিনি কেন নেবেন? এখানে অর্জুন যে শ্রীকৃষ্ণকে ‘মাধব’ অথবা লক্ষ্মীপতি বলে সম্বােধন করেছেন, তা তাৎপর্যপূর্ণ। এই নামের দ্বারা তাঁকে সম্বােধন করে অর্জুন বুঝিয়ে দিলেন, তিনি হচ্ছেন সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মীদেবীর পতি, তাই অর্জুনকে এমন কোন কার্যে প্ররােচিত করা তাঁর কর্তব্য নয়, যার পরিণতি হবে দুর্ভাগ্যজনক। শ্রীকৃষ্ণ অবশ্য কাউকেই দুর্ভাগ্য এনে দেন না, সুতরাং তাঁর ভক্তের ক্ষেত্রে তাে সেই কথা ওঠেই না।



শ্লোক ৩৭-৩৮

যদ্যপ্যেতে ন পশ্যন্তি লোভোপহতচেতসঃ ।
            কুলক্ষয়কৃতং দোষং মিত্রদ্রোহে চ পাতকম্ ॥ ৩৭ ॥

 কথং ন জ্ঞেয়মস্মাভিঃ পাপাদস্মান্নিবর্তিতুম্ ।
    কুলক্ষয়কৃতং দোষং প্রপশ্যদ্ভির্জনার্দন ॥ ৩৮ ॥


যদি—যদি; অপি—এমন কি; এতে—এরা; —না; পশ্যন্তি—দেখছে; লােভ -  লােভে; উপহত—অভিভূত; চেতসঃ—চিত্ত; কুলক্ষয়  - বংশনাশ; কৃতম্ -  জনিত; দোষম্ —দোষ; মিত্রদ্রোহে—মিত্রের প্রতি শত্রুতায়; —ও; পাতকম্ - পাপ ; কথম্ —কেন; - না; জ্ঞেয়ম্ —জানবে; অস্মাভিঃ—আমাদের দ্বারা; পাপাৎ - পাপ থেকে; অস্মাৎ—এই; নিবর্তিতুম্ —নিবৃত্ত হতে; কুলক্ষয় - বংশনাশ; কৃতম্ - জনিত; দোষম্—অপরাধ; প্রপশ্যদ্ভিঃ —দর্শনকারী; জনার্দন—হে কৃষ্ণ।


গীতার গান


যদ্যপি এরা নাহি দেখে লােভীজন ।

 কুলক্ষয় মিত্রদ্রোহ সব অলক্ষণ ॥ 

এসব পাপের রাশি কে বহিতে পারে ।

বুঝিবে তুমি ত সব বুঝবে আমারে ॥ 

উচিত কি নহে এই পাপে নিবৃত্তি।

বুঝা কি উচিত নহে সেই কুপ্রবৃত্তি ॥

কুলক্ষয়ে যেই দোষ জান জনার্দন। 

অতএব এই যুদ্ধ কর নিবারণ 


অনুবাদ

 হে জনার্দন! যদিও এরা রাজ্যলােভে অভিভূত হয়ে কুলক্ষয় জনিত দোষ ও মিত্রদ্রোহ নিমিত্ত পাপ লক্ষ্য করছে না, কিন্তু আমরা কুলক্ষয় জনিত দোষ লক্ষ্য করেও এই পাপকর্মে কেন প্রবৃত্ত হব?


তাৎপর্য

যুদ্ধে ও পাশাখেলায় আহ্বান   করা হলে কোনও ক্ষত্রিয় বিরােধীপক্ষের সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না। দুর্যোধন সেই যুদ্ধে অর্জুনকে আহ্বান করেছিলেন, তাই যুদ্ধ করতে অর্জুন বাধ্য ছিলেন। কিন্তু এই অবস্থায় অর্জুন বিবেচনা করে দেখলেন যে, তাঁর বিরুদ্ধপক্ষের সকলেই এই যুদ্ধের পরিণতি সম্বন্ধে একেবারে অন্ধ হতে পারে, কিন্তু তা বলে তিনি এই যুদ্ধের অমঙ্গলজনক পরিণতি উপলব্ধি করতে পারার পর, সেই যুদ্ধের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারবেন না। এই ধরনের আমন্ত্রণের বাধ্যবাধকতা তখনই থাকে, যখন তার পরিণতি মঙ্গলজনক হয়, নতুবা এর কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এই সব কথা সুচিন্তিতভাবে বিবেচনা করে অর্জুন এই যুদ্ধ থেকে নিরস্ত থাকতে মনস্থির করেছিলেন।



শ্লোক ৩৯ 

কুলক্ষয়ে প্রণশ্যন্তি কুলধর্মাঃ সনাতনাঃ ।
ধর্মে নষ্টে কুলং কৃৎস্নমধর্মোহভিভবত্যুত ॥ ৩৯ ॥

কুলক্ষয়ে - বংশনাশ হলে; প্রণশ্যন্তি -  বিনষ্ট হয়; কুলধর্মাঃ -  কুলধর্ম; সনাতনাঃ— চিরাচরিত; ধর্মে—ধর্ম; নষ্টে—নষ্ট হলে; কুলম্ —বংশকে; কৃৎস্নম্ —সমগ্র; অধর্মঃ—অধর্ম; অভিভবতি—অভিভূত করে; উত - বলা হয়।



গীতার গান

কুলক্ষয়ে কলুষিত সনাতন ধর্ম ।
ধর্মনষ্টে প্রাদুর্ভাবে হইবে অধর্ম ॥


অনুবাদ

 কুলক্ষয় হলে সনাতন কুলধর্ম বিনষ্ট হয় এবং তা হলে সমগ্র বংশ অধর্মে অভিভূত হয়।


তাৎপর্য

 বর্ণাশ্রম সমাজব্যবস্থায় অনেক রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেওয়া আছে, যা পরিবারের প্রতিটি লােকের যথাযথ পারমার্থিক উন্নতি সাধনে সহায়তা করে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যেরা পরিবারভুক্ত অন্য সকলের জন্ম থেকে আরম্ভ করে  মৃত্যু পর্যন্ত শুদ্ধিকরণ সংস্কার দ্বারা তাদের যথাযথ মঙ্গল সাধন করার জন্য সর্বদাই তৎপর থাকেন। কিন্তু এই সমস্ত প্রবীণ লােকদের মৃত্যু হলে, মঙ্গলজনক এই সমস্ত পারিবারিক প্রথাকে রূপ দেওয়ার মতাে কেউ থাকে না। তখন পরিবারের অল্পবয়স্ক সদস্যেরা অমঙ্গলজনক কাজকর্মে লিপ্ত হতে পারে এবং তার ফলে তাদের আত্মার মুক্তির সম্ভাবনা চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। তাই, কোন কারণেই পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা উচিত নয়।



শ্লোক ৪০

 অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্ৰদুষ্যন্তি কুলস্ত্রিয়ঃ ।।
স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্করঃ ॥ ৪০ ॥



অধর্ম—অধর্ম; অভিভবাৎ—প্রাদুর্ভাব হলে; কৃষ্ণ—হে কৃষ্ণ; প্ৰদুষ্যন্তি - ব্যভিচারে প্রবৃত্ত হয়; কুলস্ত্রিয়ঃ—কুলবধুগণ; স্ত্রীষু—স্ত্রীলােকেরা; দুষ্টাসু—অসৎ চরিত্রা হলে; বার্ষ্ণেয়—হে বৃষ্ণিবংশজ; জায়তে -  উৎপন্ন হয়; বর্ণসঙ্করঃ—অবাঞ্ছিত প্রজাতি।


গীতার গান

অধর্মের প্রাদুর্ভাবে কুলনারীগণ ।
পতিতা হইবে সব কর অন্বেষণ ॥


অনুবাদ

হে কৃষ্ণ! কুল অধর্মের দ্বারা অভিভূত হলে কুলবধূগণ ব্যভিচারে প্রবৃত্ত হয় এবং হে বার্ষ্ণেয়! কুলস্ত্রীগণ অসৎ চরিত্রা হলে অবাঞ্ছিত প্রজাতি উৎপন্ন হয়।

তাৎপর্য 

সমাজের প্রতিটি মানুষ যখন সৎ জীবনযাপন করে, তখনই সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি দেখা দেয় এবং মানুষের জীবন অপ্রাকৃত ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্ণাশ্রম প্রথার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সমাজ-ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তােলা, যার ফলে সমাজের মানুষেরা সৎ জীবনযাপন করে সর্বতােভাবে পারমার্থিক উন্নতি লাভ করতে পারে। এই ধরনের সৎ জনগণ তখনই উৎপন্ন হন, যখন সমাজের স্ত্রীলােকেরা সৎ চরিত্রবতী ও সত্যনিষ্ঠ হয়। শিশুদের মধ্যে যেমন অতি সহজেই বিপথগামী হবার প্রবণতা দেখা যায়, স্ত্রীলােকদের মধ্যেও তেমন অতি সহজেই অধঃপতিত হবার প্রবণতা থাকে। তাই, শিশু ও স্ত্রীলােক উভয়েরই পরিবারের প্রবীণদের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা ও তত্ত্বাবধানের একান্ত প্রয়ােজন। নানা রকম ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিয়ােজিত করার মাধ্যমে স্ত্রীলােকদের চিত্তবৃত্তিকে পবিত্র ও নির্মল রাখা হয় এবং এভাবেই তাদের ব্যভিচারী মনােবৃত্তিকে সংযত করা হয়। চাণক্য পণ্ডিত বলে গেছেন, স্ত্রীলােকেরা সাধারণত অল্পবুদ্ধিসম্পন্না, তাই তারা নির্ভরযােগ্য অথবা বিশ্বস্ত নয়। সেই জন্য তাদের পূজার্চনা আদি গৃহস্থালির নানা রকম ধর্মানুষ্ঠানে সব সময় নিয়ােজিত রাখতে হয় এবং তার ফলে তাদের ধর্মে মতি হয় এবং চরিত্র নির্মল হয়। তারা তখন চরিত্রবান, ধর্মপরায়ণ সন্তানের জন্ম দেয়, যারা হয় বর্ণাশ্রমধর্ম পালন করার উপযুক্ত। বর্ণাশ্রম-ধর্ম পালন না করলে, স্বভাবতই স্ত্রীলােকেরা অবাধে পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা করতে শুরু করে এবং তাদের ব্যভিচারের ফলে সমাজে অবাঞ্ছিত সন্তান-সন্ততির জন্ম হয়। দায়িত্বজ্ঞানশুন্য লােকদের পৃষ্ঠপােষকতায় যখন সমাজে ব্যভিচার প্রকট হয়ে ওঠে এবং অবাঞ্ছিত মানুষে সমাজ  ছেয়ে যায়, তখন মহামারী ও যুদ্ধ দেখা দিয়ে মানব-সমাজকে ধ্বংসােন্মুখ করে তোলে।



শ্লোক ৪১

সঙ্করাে নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্য চ।
                     পতন্তি পিতরাে হ্যেষাং লুপ্তপিণ্ডোদকক্রিয়াঃ ॥ ৪১ ॥

 সঙ্করঃ—এই প্রকার অবাঞ্ছিত সন্তান; নরকায়—নারকীয় জীবনের জন্য সৃষ্টি, এব— অবশ্যই; কুলঘ্নানাম্ -  কুলনাশক; কুলস্য - বংশের; —ও; পতন্তি—পতিত হয়; পিতরঃ -  পিতৃপুরুষেরা; হি—অবশ্যই; এষাম্ —তাদের; লুপ্ত—লুপ্ত; পিণ্ড -  পিণ্ডদান; উদক-ক্রিয়াঃ—তৰ্পণক্রিয়া।


গীতার গান

দুষ্টা স্ত্রী হইলে জন্মে বর্ণসঙ্কর দল ।
বর্ণসঙ্কর হলে হবে নরকের ফল ॥
যেই সে কারণ হয় বর্ণসঙ্করের ।
কুলক্ষয় কুলঘ্নানি যেই অপরের ॥


অনুবাদ

বর্ণসঙ্কর উৎপাদন বৃদ্ধি হলে কুল ও কুলঘাতকেরা নরকগামী হয়। সেই কুলে পিণ্ডদান ও তর্পণক্রিয়া লােপ পাওয়ার ফলে তাদের পিতৃপুরুষেরাও নরকে অধঃ পতিত হয়।

তাৎপর্য

কর্মকাণ্ডের বিধি অনুসারে পিতৃপুরুষের আত্মাদের প্রতি পিণ্ডদান ও জল উৎসর্গ করা প্রয়ােজন। এই উৎসর্গ সম্পন্ন করা হয় বিষ্ণুকে পূজা করার মাধ্যমে, কারণ বিষ্ণুকে উৎসর্গীকৃত প্রসাদ সেবন করার ফলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তিলাভ হয়। অনেক সময় পিতৃপুরুষেরা নানা রকমের পাপের ফল ভােগ করতে থাকে এবং অনেক সময় তাদের কেউ কেউ জড় দেহ পর্যন্ত ধারণ করতে পারে না। সুক্ষ্ম দেহে প্রেতাত্মারূপে থাকতে বাধ্য করা হয়। যখন বংশের কেউ তার পিতৃপুরুষদের ভগবৎ-প্রসাদ উৎসর্গ করে পিণ্ডদান করে, তখন তাদের আত্মা ভূতের দেহ অথবা অন্যান্য দুঃখময় জীবন থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি লাভ করে। পিতৃপুরুষের আত্মার সদ্ গতির জন্য এই পিণ্ডদান করাটা বংশানুক্রমিক রীতি। তবে যে সমস্ত লােক ভক্তিযােগ সাধন করেন, তাঁদের এই অনুষ্ঠান করার প্রয়ােজন নেই। ভক্তিযােগ 
সাধন করার মাধ্যমে ভক্ত শত-সহস্র পূর্বপুরুষের আত্মার মুক্তি সাধন করতে পারেন। শ্রীমদ্ভাগবতে (১১/৫/৪১) বলা হয়েছে -

দেবর্ষিভূতাপ্তনৃণাং পিতৃণাং
ন কিঙ্করাে নায়মৃণী চ রাজন্ ।
সর্বাত্মনা যঃ শরণং শরণ্যং
গতাে মুকুন্দং পরিহৃত্য কৰ্তম্ ॥ 

“যিনি সব রকম কর্তব্য পরিত্যাগ করে মুক্তি দানকারী মুকুন্দের চরণকমলে শরণ নিয়েছেন এবং ঐকান্তিকভাবে পন্থাটি গ্রহণ করেছেন, তাঁর আর দেব-দেবী, মুনিঋষি, পরিবার-পরিজন মানব-সমাজ ও পিতৃপুরুষের প্রতি কোন কর্তব্য থাকে না। পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করার ফলে এই ধরনের কর্তব্যগুলি আপনা থেকেই সম্পাদিত হয়ে যায়।”


শ্লোক ৪২

দোষৈরেতৈঃ কুলঘ্নানাং বর্ণসঙ্করকারকৈঃ ।
উৎসাদ্যন্তে জাতিধর্মাঃ কুলধর্মাশ্চ শাশ্বতাঃ ॥ ৪২ ৷৷

দোষৈঃ—দোষ দ্বারা; এতৈঃ—এই সমস্ত; কুলঘ্নানাম্ -  কুলনাশকদের; বর্ণসঙ্কর - অবাঞ্ছিত সন্তানাদি; কারকৈঃ—কারক; উৎসাদ্যন্তে—উৎপন্ন হয়; জাতিধর্মাঃ— জাতির ধর্ম; কুলধর্মাঃ—কুলের ধর্ম; - ও; শাশ্বতাঃ - সনাতন।


গীতার গান

নরকে পতন হয় লুপ্ত পিণ্ড জন্য।
তরিবার নাহি কোন উপায় যে অন্য ॥
কুলধর্মের নষ্টকারী বর্ণসঙ্কর ফলে।
শাশ্বত জাতি ধর্ম উৎসাদিত হলে ॥


অনুবাদ

যারা বংশের ঐতিহ্য নষ্ট করে এবং তার ফলে অবাঞ্ছিত সন্তানাদি সৃষ্টি করে, তাদের কুকর্মজনিত দোষের ফলে সর্বপ্রকার জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প এবং বংশের কল্যাণ-ধর্ম উৎসন্নে যায়।


তাৎপর্য

সনাতন-ধর্ম বা বর্ণাশ্রম-ধর্মের মাধ্যমে সমাজব্যবস্থায় যে চারটি বর্ণের উদ্ভব হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ যাতে তাদের জীবনের চরম লক্ষ্য মুক্তি লাভে সক্ষম হয়। তাই, সমাজের দায়িত্বজ্ঞানশুন্য নেতাদের পরিচালনায় যদি সনাতন-ধর্মের যথাযথ আচরণ না করা হয়, তবে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং ক্রমে ক্রমে মানুষ তাদের জীবনের চরম লক্ষ্য বিষ্ণুকে ভুলে যায়। এই ধরনের সমাজ-নেতাদের বলা হয় অন্ধ এবং যারা এদের অনুসরণ করে, তারা অবধারিতভাবে অন্ধকূপে পতিত হয়।



শ্লোক ৪৩

উৎসন্নকুলধর্মাণাং মনুষ্যাণাং জনার্দন।
 নরকে নিয়তং বাসাে ভবতীত্যনুশুশ্রুম ॥ ৪৩ ॥

 উৎসন্ন -  বিনষ্ট; কুলধর্মাণাম্—যাদের কুলধর্ম আছে তাদের; মনুষ্যাণাম্—সেই সমস্ত মানুষের; জনার্দন—হে কৃষ্ণ; নরকে - নরকে; নিয়তম্ -  নিয়ত; বাসঃ—অবস্থিতি; ভবতি—হয়; ইতি—এভাবে; অনুশুশ্রুম—আমি পরম্পরাক্রমে শ্রবণ করেছি।


গীতার গান

নরকে নিয়ত বাস সে মনুষ্যের হয়।
তুমি জান জনার্দন সে সব বিষয় ॥
আমি শুনিয়াছি তাই সাধুসন্ত মুখে।
নরকের পথে চলি কে রহিবে সুখে ॥


অনুবাদ

হে জনার্দন! আমি পরম্পরাক্রমে শুনেছি যে, যাদের কুলধর্ম বিনষ্ট হয়েছে, তাদের নিয়ত নরকে বাস করতে হয়।

তাৎপর্য

অর্জুনের সমস্ত যুক্তি-তর্ক তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, পক্ষান্তরে তিনি সাধুসন্ত আদি মহাজনদের কাছ থেকে আহরণ করা জ্ঞানের ভিত্তিতে এই সমস্ত যুক্তির অবতারণা করেছিলেন। প্রকৃত জ্ঞান উপলব্ধি করেছেন যে-মানুষ, তাঁর তত্ত্বাবধানে এই জ্ঞান শিক্ষালাভ না করলে, এই জ্ঞান আহরণ করা যায় না। বর্ণাশ্রম-ধর্মের বিধি অনুসারে মানুষকে মৃত্যুর পূর্বে তার সমস্ত পাপ মােচনের জন্য কতকগুলি প্রায়শ্চিত্ত বিধি পালন করতে হয়। যে সব সময় পাপকার্যে লিপ্ত থেকে জীবন অতিবাহিত করেছে, তার পক্ষে এই বিধি অনুসরণ করে প্রায়শ্চিত্ত করাটা অবশ্য কর্তব্য। প্রায়শ্চিত্ত না করলে তার পাপের ফলস্বরূপ মানুষ নরকে পতিত হয়ে নানা রকম দুঃখকষ্ট ভােগ করে।


শ্লোক ৪৪

অহাে বত মহৎ পাপং কর্তুং ব্যবসিতা বয়ম্ ।
যদ্ রাজ্যসুখলােভেন হন্তুং স্বজনমুদ্যতাঃ ॥ ৪৪ ৷

অহো - হায়; বত - কী আশ্চর্য; মহৎ—মহা; পাপম্ -  পাপ; কর্তুম্ - করতে; ব্যবসিতাঃ - সংকল্পবদ্ধ; বয়ম্ —আমরা; যৎ—যেহেতু; রাজ্য-সুখ-লােভেন - রাজ্যসুখের লােভে; হন্তম্  - হত্যা করতে; স্বজনম্ —আত্মীয়-স্বজনদের; উদ্যতাঃ - উদ্যত।


গীতার গান

হায় হায় মহাপাপ করিতে উদ্যত। 
হয়েছি আমরা শুধু হয়ে কলুষিত ॥
রাজ্যের লােভেতে পড়ে এ দুষ্কার্য করি ।
স্বজন হনন এই উচিত কি হরি? ॥


অনুবাদ

হায়! কী আশ্চর্যের বিষয় যে, আমরা রাজ্যসুখের লােভে স্বজনদের হত্যা করতে উদ্যত হয়ে মহাপাপ করতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছি।

তাৎপর্য

স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষকে মাতা-পিতা, ভাই-বন্ধুকে হত্যা করতে দেখা যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে এর অনেক নজির আছে। কিন্তু ভগবদ্ভক্ত অর্জুন সদাসর্বদা নৈতিক কর্তব্য অকর্তব্যের প্রতি সচেতন, তাই তিনি এই ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকাকেই শ্রেয় বলে মনে করেছেন।


শ্লোক ৪৫

যদি মামপ্রতীকারমশস্ত্রং শস্ত্রপাণয়ঃ ।
                    ধার্তরাষ্ট্রা রণে হন্যুস্তন্মে ক্ষেমতরং ভবেৎ ॥ ৪৫ ॥

যদি—যদি; মাম্ —আমাকে; অপ্রতীকারম্—প্রতিরােধ রহিত; অশস্ত্রম্ -  নিরস্ত্র; শস্ত্রপাণয়ঃ—শস্ত্রধারী; ধার্তরাষ্ট্রাঃ—ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা; রণে -  রণক্ষেত্রে; হন্যু -  হত্যা করে; তৎ—তবে; মে—আমার; ক্ষেমতরম্ —অধিকতর মঙ্গল; ভবেৎ - হবে।


গীতার গান

যদি ধার্তরাষ্ট্রগণ আমাকে মারিয়া।
এই রণে রাজ্য লয় অশস্ত্র বুঝিয়া ॥
সেও ভাল মনে করি যুদ্ধ সে অপেক্ষা।
বিনাযুদ্ধে সেই আমি করিব প্রতীক্ষা ।।


অনুবাদ

প্রতিরােধ রহিত ও নিরস্ত্র অবস্থায় আমাকে যদি শস্ত্রধারী ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা যুদ্ধে বধ করে, তা হলে আমার অধিকতর মঙ্গলই হবে।

তাৎপর্য

ক্ষত্রিয় রণনীতি অনুসারে নিয়ম আছে, শত্রু যদি নিরস্ত্র হয় অথবা যুদ্ধে অনিচ্ছুক হয়, তবে তাকে আক্রমণ করা যাবে না। কিন্তু অর্জুন স্থির করলেন যে, এই রকম বিপজ্জনক অবস্থায় তাঁর শত্রুরা যদি তাকে আক্রমণও করে, তবুও তিনি যুদ্ধ করবেন না। তিনি বিবেচনা করে দেখলেন না, শত্রুপক্ষ যুদ্ধ করতে কতটা আগ্রহী ছিল। অর্জুনের এই ধরনের আচরণ ভগবদ্ভক্তোচিত কোমল হৃদয়বৃত্তির পরিচায়ক।


শ্লোক ৪৬

সঞ্জয় উবাচ
এবমুক্ত্বার্জুনঃ সংখ্যে রথােপস্থ উপাবিশৎ।
বিসৃজ্য সশরং চাপং শােকসংবিগ্নমানসঃ ॥ ৪৬ ॥



সঞ্জয়ঃ উবাচ—সঞ্জয় বললেন; এবম্ —এভাবে; উক্ত্বা —বলে; অর্জুনঃ—অর্জুন; সংখ্যে—যুদ্ধক্ষেত্রে; রথােপস্থে - রথের উপর; উপাবিশৎ—উপবেশন করলেন; বিসৃজ্য - ত্যাগ করে; সশরম্ —শরযুক্ত; চাপম্ - ধনুক; শােক—শােক দ্বারা; সংবিগ্ন—অভিভূত; মানসঃ—চিত্তে।


গীতার গান

একথা বলিয়া পার্থ নিশ্চল বসিল।
রথােপস্থ যুদ্ধ মধ্যে অস্ত্র সে ত্যজিল ॥
শােকেতে উদ্বিগ্নমনা অর্জুন সদয় ।
বিষাদ-যােগ নাম এই গীতার বিষয় ॥


অনুবাদ

সঞ্জয় বললেন-  রণক্ষেত্রে এই কথা বলে অর্জুন তাঁর ধনুর্বাণ ত্যাগ করে শােকে ভারাক্রান্ত চিত্তে রথােপরি উপবেশন করলেন।

তাৎপর্য

শত্রুসৈন্যকে নিরীক্ষণ করতে অর্জুন রথের উপর দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু তিনি শােকে এতই মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর গাণ্ডীব ধনু ও অক্ষয় তূণ ফেলে দিয়ে, তিনি রথের উপর বসে পড়লেন। এই ধরনের কোমল হৃদয়বৃত্তি-সম্পন্ন মানুষই কেবল ভগবদ্ভক্তি সাধন করার মাধ্যমে সমগ্র জগতের যথার্থ মঙ্গল সাধন করতে পারেন।

ভক্তিবেদান্ত কহে শ্রীগীতার গান।
শুনে যদি শুদ্ধ ভক্ত কৃষ্ণগত প্রাণ ॥

ইতি—কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে সেনা-পর্যবেক্ষণ বিষয়ক ‘বিষাদ-যােগ’ নামক শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতার প্রথম অধ্যায়ের ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য সমাপ্ত।



  ★ হরে কৃষ্ণ ★

বি.দ্র. - সরাসরি শ্রীমদ্ভাগবত যথাযত হতে সংগ্রহীত 


No comments:

Post a Comment