দ্বিতীয় অধ্যায়

সাংখ্য যো

 শ্লোক ১

তং তথা কৃপয়াবিষ্টমশ্রুপূর্ণাকুলেক্ষণম্

বিষীদন্তমিদং বাক্যমুবাচ মধুসূদনঃ ॥ ১ ॥

 

সঞ্জয়ঃ উবাচসঞ্জয় বললেন; ম্অর্জুনকে; তথাএভাবে;  কৃপয়া - কৃপায়; আবিষ্টম্আবিষ্ট হয়ে; শ্রুপূর্ণঅশ্রুসিক্ত; আকুল - ব্যাকুল; ঈক্ষণম্ চক্ষু; বিষীদন্তম্ অনুশোচনা করে; ইদম্এই; বাক্যম্ কথাগুলি; উবাচ - বললেন; মধুসূদনঃমধুহন্তা

 


গীতার গান

সঞ্জয় কহিলঃ

দেখিয়া অর্জুনে কৃষ্ণ সেই অশ্রুজলে ।

কৃপায় আবিষ্ট হয়ে ভাবিত বিকলে ।

কৃপাময় মধুসূদন কহিল তাহারে ।

ইতিবাক্য বন্ধুভাবে অতি মিষ্টস্বরে

অনুবাদ

সঞ্জয় বললেন-অর্জুনকে এভাবে অনুতপ্ত, ব্যাকুল ও অশ্রুসিক্ত দেখে, কৃপায় আবিষ্ট হয়ে মধুসূদন বা শ্রীকৃষ্ণ এই কথাগুলি বললেন

তাৎপর্য

জাগতিক করুণা, শোক ও চোখের জল হচ্ছে প্রকৃত সত্তার অজ্ঞানতার বহিঃপ্রকাশ। শাশ্বত আত্মার জন্য করুণার অনুভব হচ্ছে আত্ম-উপলব্ধি। এই শ্লোকেমধুসদনশব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রীকৃষ্ণ মধু নামক দৈত্যকে হত্যা করেছিলেন এবং এখানে অর্জুন চাইছেন, অজ্ঞতারূপ যে দৈত্য তাকে তার কর্তব্যকর্ম থেকে বিরত রেখেছে, তাকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হত্যা করুন। মানুষকে কিভাবে করুণা প্রদর্শন করতে হয়, তা কেউই জানে না। যে মানুষ ডুবে যাচ্ছে, তার পরনের কাপড়ের প্রতি করুণা প্রদর্শন করাটা নিতান্তই অর্থহীন। তেমনই, যে মানুষ ভবসমুদ্রে পতিত হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে, তার বাইরের আবরণ জড় দেহটিকে উদ্ধার করলে তাকে উদ্ধার করা হয় না । এই কথা যে জানে না এবং যে জড় দেহটির জন্য শোক করে, তাকে বলা  হয় শুদ্র, অর্থাৎ যে অনর্থক শোক করে। অর্জুন ছিলেন ক্ষত্রিয়, তাই তাঁর কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ আশা করা যায় না। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের শোকসন্তপ্ত হৃদয়কে শান্ত করতে পারেন, তাই তিনি অর্জুনকে ভগবদগীতা শোনালেন। গীতার এই অধ্যায়ে জড় দেহ ও চেতন আত্মার সম্বন্ধে বিশদভাবে আলোচনার মাধ্যমে পরম নিয়ন্তা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন আমাদের স্বরূপ কি, আমাদের প্রকৃত পরিচয় কি। পারমার্থিক তত্ত্বের উপলব্ধি এবং কর্মফলে নিরাসক্তি ছাড়া এই অনুভূতি হয় না

শ্লোক-২

শ্রীভগবানুবাচ

কুতস্ত্বা কশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিতম্ ।

অনার্যজুষ্টমস্বর্গ্যমকীর্তিকরমর্জুন ॥ ২॥

শ্রীভগবান্ উবাচপরমেশ্বর ভগবান বললেন; কুতঃকোথা থেকে; ত্বাতোমার; শ্মলম্ -  কলুষ; ইদম্এই অনুশোচনা; বিষমেসঙ্কটকালে; সমুপস্থিতম্ - উপস্থিত হয়েছে; অনার্যযে মানুষ জীবনের মূল্য জানে না; জুষ্টম্ উচিত;  অস্বর্গ্যম্ —যে কার্য উচ্চতর লোকে নিয়ে যায় না; অকীর্তি —অপকীর্তি, করম্ - কারণ; অর্জুন—হে অর্জুন

গীতার গান

শ্রীভগবান কহিলেনঃ

কিভাবে অর্জুন তুমি ঘোর যুদ্ধস্থলে।

অনার্যের শোকানল প্রদীপ্ত করিলে ॥

অকীর্তি অস্বর্গ লাভ হইবে তোমার ।

ছি ছি বন্ধু ছাড় এই অযোগ্য আচার

 

অনুবাদ

পুরুষোত্তম শ্রীভগবান বললেন—প্রিয় অর্জুন, এই ঘোর সঙ্কটময় যুদ্ধস্থলে যারা জীবনের প্রকৃত মূল্য বোঝে না, সেই সব অনার্যের মতো শোকানল তোমার হৃদয়ে কিভাবে প্রজ্বলিত হল? এই ধরনের মনোভাব তোমাকে স্বর্গলোকে উন্নীত করবে না, পক্ষান্তরে তোমার সমস্ত যশরাশি বিনষ্ট করবে

তাৎপর্য

শ্রীকৃষ্ণ ও পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন অভিন্ন। তাই সমগ্র ভগবদগীতায় তাঁকে ভগবান বলে সম্বোধন করা হয়েছে। ভগবান হচ্ছেন পরম-তত্ত্বের চরম সীমা। পরমতত্ত্ব উপলব্ধির তিনটি স্তর রয়েছে -ব্ৰহ্ম অর্থাৎ নির্বিশেষ সর্বব্যাপ্ত সত্তা, পরমাত্মা অর্থাৎ প্রতিটি জীবের হৃদয়ে বিরাজমান পরমেশ্বরের প্রকাশ এবং ভগবান অর্থাৎ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। পরম-তত্ত্বের এই বিশ্লেষণ সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভাগবতে (১/২/১১) বলা হয়েছে -

বদন্তি তৎ তত্ত্ববিদস্তত্ত্বং যজ্জ্ঞানমন্বয়ম্

ব্রহ্মেতি পরমাত্মেতি ভগবানিতি শব্দ্যতে ॥

যা অদ্বয় জ্ঞান, অর্থাৎ এক অদ্বিতীয় বাস্তব বস্তু, জ্ঞানীরা তাকেই পরমার্থ বলেন। সেই পরমতত্ত্ব ব্রহ্ম, পরমাত্মা ও ভগবান—এই ত্রিবিধ সংজ্ঞায় অভিব্যক্ত হয়।

এই তিনটি চিন্ময় প্রকাশ সূর্যের দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়। সূর্যেরও তিনটি বিভিন্ন প্রকাশ রয়েছে, যেমন—সূর্যরশ্মি, সূর্যগোলক ও সূর্যমণ্ডল। সূর্যরশ্মি সম্বন্ধে জানাটা প্রাথমিক স্তর, সূর্যগোলক সম্বন্ধে জানাটা আরও উচ্চ স্তরের এবং সূর্যমণ্ডলে প্রবেশ করে সূর্য সম্বন্ধে জানাটা হচ্ছে সর্বোচ্চ। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা সূর্যকিরণ সম্বন্ধে জেনেই সন্তুষ্ট থাকে—তার সর্বব্যাপকতা এবং তার নির্বিশেষ রশ্মিছটা সম্বন্ধে যে জ্ঞান, তাকে পরম-তত্ত্বের ব্রহ্ম-উপলব্ধির সঙ্গে তুনা করা যেতে পারে। যাঁরা আরও উন্নত স্তরে রয়েছেন, তারা সূর্যগোলকের সম্বন্ধে অবগত, সেই জ্ঞানকে পরম-তত্ত্বের পরমাত্মা উপলব্ধির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে এবং যারা সূর্যমণ্ডলের অন্তঃস্থলে প্রবিষ্ট হয়েছেন, তাদের জ্ঞান পরম-তত্তের সর্বোত্তম সবিশেষ রূপ সম্বন্ধে অবগত হওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তাই, ভগবদ্ভক্তবৃন্দ অথবা যে সমস্ত পরমার্থবাদী পরম-তত্ত্বের ভগবৎ-স্বরূপ উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তাঁরাই হচ্ছেন সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত পরমার্থবাদী, যদিও সমস্ত পরমার্থবাদীরা সেই একই পরম-তত্ত্বের অনুসন্ধানে রত। সূর্যরশ্মি, সূর্যগোলক ও সূর্যমণ্ডল—এই তিনটি একে অপর থেকে পৃথক হতে পারে না, কিন্তু তবুও তিনটি বিভিন্ন স্তরের অন্বেষণকারীরা সমপর্যায়ভুক্ত নন। শ্রীল ব্যাসদেবের পিতা পরাশর মুনি ভগবান্ কথাটির বিশ্লেষণ করেছেন। সমগ্র ঐশ্বর্য, সমগ্র বীর্য, সমগ্র যশ, সমগ্ৰ শ্ৰী, সমগ্র জ্ঞান ও সমগ্র বৈরাগ্য যার মধ্যে পূর্ণরূপে বর্তমান, সেই পরম পুরুষ হচ্ছেন ভগবান। অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁরা খুব ধনী, অত্যন্ত শক্তিশালী, সুপুরুষ, অত্যন্ত জ্ঞানী ও অত্যন্ত অনাসক্ত, কিন্তু এমন কেউ নেই যার মধ্যে সমগ্র ঐশ্বর্য, সমগ্র বীর্য আদি গুণগুলি পূর্ণরূপে বিরাজমান। কেবল শ্রীকৃষ্ণই তা দাবি করতে পারেন, কারণ তিনি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। কোন জীবই, এমন কি ব্রহ্মা, শিব অথবা নারায়ণও শ্রীকৃষ্ণের মতো পূর্ণ ঐশ্বর্যসম্পন্ন হতে পারেন না। তাই, ব্রহ্মসংহিতাতে ব্রহ্মা নিজে বলেছেন যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। তাঁর

চেয়ে বড় আর কেউ নেই, এমন কি তার সমকক্ষও কেউ নেই। তিনিই হচ্ছেন আদি পুরুষ, অথবা গোবিন্দ নামে পরিজ্ঞাত ভগবান এবং তিনি হচ্ছেন সর্ব কারণের পরম কারণ—

ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ

অনাদিরাদিগোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্ ॥

ভগবানের গুণাবলী ধারণকারী বহু পুরুষ আছেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরম পুরুষ, কারণ তাঁর ঊর্ধ্বে আর কেউ নেই।  তিনি হচ্ছেন পরমেশ্বর এবং তার শ্রীবিগ্রহ সচ্চিদানন্দময়। তিনি হচ্ছেন অনাদির আদিপুরুষ গোবিন্দ এবং তিনিই হচ্ছেন সর্ব কারণের কারণ।” (ব্রহ্মসংহিতা ৫/১)

ভাগবতেও পরমেশ্বর ভগবানের অনেক অবতারের বর্ণনা আছে, কিন্তু সেখানেও বলা হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পুরুষোত্তম এবং তাঁর থেকে বহু বহু অবতার ও ঈশ্বর বিস্তার লাভ করে—

এতে চাংশকলাঃ পুংসঃ কৃষ্ণস্তু ভগবান্ স্বয়ম্ ।

ইন্দ্রারিব্যাকুলং লোকং মৃড়য়ন্তি যুগে যুগে ।।

সমস্ত অবতারেরা হচ্ছেন ভগবানের অংশ অথবা তাঁর অংশের অংশ-প্রকাশ, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান।” (ভাগবত ১/৩/২৮)

তাই শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবানের আদিরূপ, পরমতত্ত্ব এবং পরমাত্মা ও নির্বিশেষ ব্রহ্মের উৎস। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সামনে আত্মীয়-পরিজনদের জন্য অর্জুনের এই শোক অত্যন্তশোভন, তাই ভগবান আশ্চর্যান্বিত হয়ে ব্যক্ত করেছেন, কুতঃ, কোথা থেকে। এই ধরনের ভাবপ্রবণতা পুরুষোচিত নয় এবং একজন সুসভ্য আর্যের কাছ থেকে এটি কখনই আশা করা যায় না। আর্য বলে তাকেই অভিহিত করা হয়, যিনি জীবনের মূল্য বোঝেন এবং যাঁর সভ্যতা অধ্যাত্ম উপলব্ধির ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। যে সমস্ত মানুষ তাদের দেহাত্মবুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হয়, তারা কখনই উপলব্ধি করতে পারে না যে, জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমতত্ত্ব বিষ্ণু বা ভগবানকে উপলব্ধি করা। তারা জড় জগতের বহিরঙ্গা রূপের দ্বারা মোহিত হয়, তাই তারা জানে না মুক্তি বলতে কি বোঝায়। জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হবার জ্ঞান যাদের নেই, তাদেরকে বলা হয় অনার্য। যদিও অর্জুন ছিলেন ক্ষত্রিয়, তবুও যুদ্ধ করতে অস্বীকার করে তিনি তাঁর স্বধর্ম থেকে বিচ্যুত হচ্ছিলেন। এই ধরনের কাপুরুষতা অনার্যের কাছ থেকেই কেবল আশা করা যায়। এভাবে কর্তব্যকর্ম থেকে বিচ্যুত হলে আধ্যাত্মিক জীবনে অগ্রসর হওয়া যায় না, এমন কি পার্থিব জগতে কাউকে যশস্বী হওয়ার সুযোগও প্রদান করে না। আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি অর্জুনের এই তথাকথিত সহানুভূতিকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনুমোদন করেননি

শ্লোক -৩

ক্লৈব্যং মা স্ম গমঃ পার্থ  নৈতত্ত্বয্যুপপদ্যতে

ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং ত্যক্ত্বোত্তিষ্ঠ পরন্তপ ॥ ৩ ॥

ক্লৈব্যম্ -ক্লীবত্ব; মা  স্ম-করো না;  গমঃ—গ্রহণ করা; পার্থ-হে পৃথাপুত্র; ন– কখনই নয়; এতৎ—এই; ত্বয়ি—তোমার; উপপদ্যতে—উপযুক্ত; ক্ষুদ্রম্—ক্ষুদ্র; হৃদয়-হৃদয়ের; দৌর্বল্যম্—দুর্বলতা; ত্যক্ত্বা—পরিত্যাগ করে; উত্তিষ্ঠ—উঠ; পরন্তপ—শত্রু দমনকারী

গীতার গান

নপুংসক নই পার্থ এ কি ব্যবহার ।

যোগ্য নহে এ কার্য বন্ধু যে আমার

হৃদয়দৌর্বল্য এই নিশ্চয়ই জানিবে

ছাড় এই, কর যুদ্ধ যদি শত্রুকে মারিবে


অনুবাদ

হে পার্থ! এই সম্মান হানিকর ক্লীত্বের বশবর্তী হয়ো না। এই ধরনের আচরণ তোমার পক্ষে অনুচিত। হে পরন্তপ! হৃদয়ের এই ক্ষুদ্র দুর্বলতা পরিত্যাগ করে তুমি উঠে দাঁড়াও

 

তাৎপর্য

অর্জুন ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের পিতা বসুদেবের ভগিনী পৃথার পুত্র, তাই তাঁকে এখানেপার্থনামে সম্বোধন করে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। ক্ষত্রিয়ের সন্তান যদি যুদ্ধ করতে অস্বীকার করে, তখন বুঝতে হবে, সে কেবল নামেই ক্ষত্রিয়; তেমনই, ব্রাহ্মণের সন্তান যখন অধার্মিক হয়, তখন বুঝতে হবে, সে কেবল নামেই ব্রাহ্মণ। এই ধরনের ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়েরা তাদের পিতার অযোগ্য সন্তান। তাই, শ্রীকৃষ্ণ চাননি, অর্জুন অযোগ্য ক্ষত্রিয় সন্তান বলে কুখ্যাত হোক। অর্জুন ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং শ্রীকৃষ্ণ তাঁর রথের সারথি হয়ে নিজেই তাঁকে পরিচালিত করছিলেন। কিন্তু এই সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও যদি অর্জুন যুদ্ধ না করে, তবে তা হবে নিতান্ত অখ্যাতির বিষয়। তাই, শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বললেন, এই রকম আচরণ করা তাঁর পক্ষে অশোভন। অর্জুন যুক্তি দেখিয়েছিলেন, অত্যন্ত সম্মানীয় ভীষ্ম ও নিজের আত্মীয়দের প্রতি উদার মনোভাবহেতু তিনি যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করবেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাকে বুঝিয়েছিলেন, এই ধরনের মহানুভবতা হৃদয়ের দুর্বলতা ছাড়া আর কিছু নয়। এই ধরনের ভ্রান্ত মহানুভবতাকে মহাজনেরা কখনই অনুমোদন করেননি। সুতরাং শ্রীকৃষ্ণের পরিচালনায় অর্জুনের মতো পুরুষের এই ধরনের মহানুভবতা, অথবা তথাকথিত অহিংসা পরিত্যাগ করা উচিত

শ্লোক - ৪

অর্জুন উবাচ

কথং ভীষ্মমহং সংখ্যে দ্রোণং চ মধুসূদন  

ইযুভিঃ প্রতিযোৎস্যামি পূজার্হাবরিসূদন  ॥ ৪ ।।

 

র্জুনঃ উবাচ—অর্জুন বললেন; কথম্ —কিভাবে;  ভীষ্মমম্ - ভীষ্ম ; অহম্‌—আমি; সংখ্যে—যুদ্ধে; দ্রোণম্—দ্রোণাচার্য; চ—ও; মধুসূদন—হে মধুহন্তা; ষুভিঃ - বাণের দ্বারা; প্রতিযোৎস্যামি—প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব; পূজাহৌ—পূজনীয়; অরিসূদন হে শক্ৰহন্তা

 

গীতার গান

অর্জুন কহিলেনঃ

মধুসূদন! কি আজ্ঞা কর তুমি মোরে ।

    ভীষ্ম দ্রোণ গুরুজন তারে মারিবারে ?

পূজার যোগ্য যে তাঁরা হন নিত্যকাল ।

তাঁদের শরীরে বাণ সুতীক্ষ্ণ ধারাল ?

 

অনুবাদ

অর্জুন বললেন-হে অরিসূদন! হে মধুসূদন! এই যুদ্ধক্ষেত্রে ভীষ্ম ও দ্রোণের মতো পরম পূজনীয় ব্যক্তিদের কেমন করে আমি বাণের দ্বারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব?

 

তাৎপর্য

পিতামহ ভীষ্ম ও শিক্ষক দ্রোণাচার্যের মতো গুরুজনেরা সর্বদাই পূজনীয়। এমন কি যদি তাঁরা আক্রমণও করেন, তবুও তাঁদের প্রতি-আক্রমণ করা উচিত নয়। সাধারণ শিষ্টাচার হচ্ছে যে, গুরুজনদের প্রতি এমন কি মৌখিক তর্কযুদ্ধ করাও উচিত নয়। এমন কি তাঁদের আচরণ যদি কখনও কখনও রূঢ়ও হয়, তবুও তাঁদের প্রতি রূঢ়ভাবে আচরণ করা উচিত নয়। তা হলে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতি-আক্রমণ করা অর্জুনের পক্ষে কি করে সম্ভব? শ্রীকৃষ্ণ কি কখনও তাঁর পিতামহ উগ্রসেন অথবা তাঁর গুরুদেব সান্দীপনি মুনিকে আক্রমণ করতে সমর্থ হবেন? অর্জুন যুদ্ধ থেকে বিরত হবার জন্য শ্রীকৃষ্ণকে এই রকম যুক্তি প্রদর্শন করলেন

শ্লোক - ৫

গুরূনহত্বা হি মহানুভাবান্

                    শ্ৰেয়ো ভোক্তুং ভৈক্ষ্যমপীহ লোকে ।

  হত্বার্থকামাংস্তু গুরূনিহৈব

                            ভুঞ্জীয় ভোগান্ রুধিরপ্রদিগ্ধান্          ॥ ৫

 

গুরূন্—গুরুজনেরা; অহত্বা-হত্যা না করে; হি—অবশ্যই; মহানুভাবান্–মহান আত্মাগণ; শ্রেয়ঃ—শ্রেয়; ভোক্তুম্ভোগ করা; ভৈক্ষ্যম্—ভিক্ষার দ্বারা; অপি— ও; ইহ—এই জীবনে; লোকে—এই জগতে; হত্বা-হত্যা করে; অর্থ—লাভ; কামান্ —কামনা করে; তু—কিন্তু; গুরূন্-গুরুজনদের; ইহ—এই জগতে; এব— অবশ্যই; ভুঞ্জীয়—ভোগ করতে হবে; ভোগান্ভোগ্যবস্তু; রুধির—রক্ত,প্রদিন্ধান্—মাখা

 

গীতার গান

শুধু গুরু নহে তাঁরা,               মহানুভব হয় যাঁরা,

হত্যা করি তাঁদের সবারে ।

তদপেক্ষা ভিক্ষা ভাল,            কাটিয়ে যাইবে কাল,

মিথ্যা যুদ্ধ করাও আমারে ॥

হত্যা এই মহাকাম,                 বিধি যে হইল বাম,

এই যুদ্ধে গুরু হত্যা হবে ।

সে ভোগ রুধিরমাখা,             কেমনে করিব সখা,

সে যুদ্ধ কে করিয়াছে কবে

 

অনুবাদ

আমার মহানুভব শিক্ষাগুরুদের জীবন হানি করে এই জগৎ ভোগ করার থেকে বরং ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করা ভাল। তাঁরা পার্থিব বস্তুর অভিলাষী হলেও আমার গুরুজন। তাঁদের হত্যা করা হলে, যুদ্ধলব্ধ সমস্ত ভোগ্যবস্তু তাঁদের রক্তমাখা হবে

পেইজ-৯৪ সমাপ্ত


 সাইট সম্মৃদ্ধির কাজ চলছে। খুব দ্রুত পরবর্তী শ্লোক সম্মুহ আপলোড করা হবে। আমাদের সাথে থাকুন।

নিয়মিত গীতা পাঠ করুন,

সুখী জীবন লাভ করুন।

  ★ হরে কৃষ্ণ ★

বি.দ্র. - সরাসরি শ্রীমদ্ভাগবত যথাযত হতে সংগ্রহীত 

No comments:

Post a Comment